বাংলায় জাত সমস্যা নেই? লেখক- শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় (আনন্দবাজার পত্রিকা, শতবার্ষিকী ক্রোড়পত্র ২৩/০২/২০২২ পৃষ্ঠা ৬)
বাংলায় জাত সমস্যা নেই?
লেখক- শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়
(আনন্দবাজার পত্রিকা,
শতবার্ষিকী ক্রোড়পত্র ২৩/০২২০২২ পৃষ্ঠা ৬)
অনেক বাঙালি ভদ্রলোক মানে করেন তাঁদের সমাজে জাত পাতেরসমস্যাটি নেই।
এবং এখানেই অন্যানা প্রদেশের সঙ্গে তাঁদের তফাত। সাম্প্রতিক কালে কিন্তু অনেক ইতিহাসবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক
দেখিয়েছেন যে, এই ধারণাটি ঠিক নয়। অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে রীতিগত কিছু পার্থক্য
থাকলেও জাতিভেদ বাঙালি সমাজে বুরাবরই বেশ জোরদার। বিশেষ করে সামাজিক সুবিধা সুযোগের
বণ্টনের ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়নের প্রশ্নে যথেষ্টি বৈষম্য এখানেও চোখে পড়ে। তফসিলি জাতি, আদিবাসী এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির লোকেদের প্রতি বৈষম্যমূলক সামাজিক আচরণ প্রায়ই
প্রকাশ্যে এসে পড়ে। সংরক্ষণ নীতি নিয়ে অভিযোগ যতটা
শোনা যায়,
জাতিভেদ প্রথা
দূরীকরণের জন্য উৎসাহ ততটা
চোখে পড়ে না। স্বাধীনাহার পর গত
পঁচাত্তর বছরে আমরা এখনও এক জন মুখ্যমন্ত্রী দেখিনি যিনি কোনও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী
থেকে উঠে এসেছেন, যেতা অন্য অনেক
প্রদেশে ইতিমধ্যেই দেখেছি। বাঙালি আধুনিকতা ও প্রমাতিশীলতার এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে তাই একটু আলোচনা দরকার।
দ্বদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে বাংলার বর্ণ ব্যবস্থা কায়েম হয় ও ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য এই তিন জাতি
উচ্চ জাতি বলে পরিচিতি লাভ করে। সীমিত সামাজিক গতিশীলতার
কারণে কয়েকটি নবশাখ জাতির উত্থান ঘটলেও, সমাজ, সম্পদ ও রাজনৈতিক
ক্ষমতার উপর এই তিন জাতির আধিপত্য ছিল
প্রশ্নাতীত। ঔপনিবেশিক যুগে এঁদের অনেকে ‘ভদ্রলোক’ বলে পরিচিতি লাভ করেন। এঁদের ক্ষমতার
উৎস ছিল জমির মালিকানা, শিক্ষা এবং চাকরি।
আর ছিল কয়েক শতাব্দীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি। এই সঙ্কীর্ণ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর বাইরের কিছু লোকও শিক্ষা এয়া
চাকরির জোরে ভদ্রলোক বলে বিবেচিত হলেও
কিন্তু তাঁদের সংখ্যা অতি নগণ্য।
এই শিক্ষিত উচ্চবর্ণের ভদ্রলোকেরাই
ছিলেন বাঙালি ‘রেনেসাঁস’ অর্থাৎ বাঙালি
আধুনিকতার জনক। এঁদের নেয়তে ঊনবিংশ শতকে সংগঠিত হয়েছিল। বিবিদ সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলন। কিন্তু তার বিষয়সূচিতে জাতিভেদ প্রথা সংস্কারের কোনও কার্যক্রম কখনও ছিল না। কারণ বর্ণাশ্রম ব্যবস্থা সম্বন্ধে
ভদ্রলোক সংস্কারকদের ছিল এর মিশ্র ধারণা।
-------(কয়েকটি লাইন পড়া যাচ্ছে না তাই দিতে পারছি না।)—পশ্চিমি সমাজ বিন্যাসের
চাইতে এটি অনেক শ্রেয়, কারণ, এখানে সামাজিক সংঘাতের সম্ভাবনা কম। ভারতীয় সভ্যতার ঊৎকর্ষের
এটি সূচক। জাতীয়তাবাদের সঙ্গেও তাই বর্ণ ব্যবস্থার একটা যোগ স্থাপিত হয়, গান্ধীজির
দর্শনে যা বৈধতা পায়। গান্ধীজির মতে বর্ণাশ্রম
শুভ, কিন্তু অস্পৃশ্যতা এই
সমাজব্যবস্থায় একটি বিকার। তাই অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অঙ্গ হয়ে উঠলেও, জাতিভেদ প্রথার বিজয়ে কেউ বিশেষ কথা বলেন না। বাঙালি সমাজ
সংস্কারক ও রাজনৈতিক নেতারাও ছিলেন এই মতের অনুগামী।
কিন্তু অস্পৃশ্যতার সঙ্গে জাতিভেদ প্রথা এমনই
অঙ্গান্তি জড়িত যে, একটির সংস্কার
না হলে অন্যটি অপসারণ সম্ভব নয়। ----- উঁচু জাতের প্রয়োজন হয় নিচু জাতের লোকের, না হলে সামাজিক পদমর্যাদার কোনও
মূল্য থাকে না। আর এই উঁচু -নিচুর ধারণাটির সঙ্গে শুধু ছোঁইয়াছুঁয়ি নয়, জড়িয়ে আছে সামাজিক
ন্যায় ও সম্পদ ও ক্ষমতার বণ্টনের প্রশ্নটিও। বাঙালি ভদ্রলোক গণতান্ত্রিক সংস্কার চাইতেন
ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক গণপরিসরে নিজেদের প্রতিনিধির্ব দাবি করতেন। কিন্তু সেই ক্ষমতা
নিচু তলার লোকেদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার আগ্রহ তাঁদের ছিল না। নিম্নবর্গের ক্ষমতায়নের
পরিবর্তে, নিদেজদেরকেই ভাঁদের প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন।
নিম্নবর্ণের লোকেরা কিন্তু এই কর্তৃত্ব মুখ বুজে মেনে নেননি। শুরু হয় দলিত
মানুষের প্রতিবাদী আন্দোলন, বর্ণবৈষম্যের
বিরুদ্ধে,
সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও অধিকার আদায়ের জন্যে। ১৮৭২ থেকে পূর্ব
বাংলার নমশূদ্রদের, এবং তার কিছু দিনের
মধ্যেই উত্তরবঙ্গে রাজবংশী ও দক্ষিণবঙ্গে পৌন্ড্র সম্প্রাদায়ের মধ্যে শুরু হয়েছে
সামাজিক স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলন। ভদ্রলোক জাতীয়তাবাদীরা এই আন্দোলনগুলিকে সমর্থন করার পরিবর্তে এগুলিকে জাতীয়
ঐক্যবিরোধী বিভাজনমূলক কাজকর্ম বলে মনে করতেন। আর তাই স্বদেশি আন্দোলনের (১৯০৫-০৮) সময় যখন তাঁরা গণসমর্থন লাভের চেষ্টা শুরু করলেন, দলিত গোষ্ঠীর অনেকেই তখন মুখ ঘুরিয়ে রইলেন। এমনকি গাগীজির
নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন শুরু হওয়ার পরেও অনেক দলিত গোষ্ঠীকেই এই আন্দোলনে শামিল হতে
দেখা যায়নি। কারণ এর মধ্যে প্রকৃত ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা তাঁরা দেখতে পাননি।
উপনিবেশিক যুগে রাজনীতির আর একটি পরিসর ছিল, যা হল প্রাতিষ্ঠানিক গণপরিসর, যেখানে উনবিংশ
শতকের শেষ থেকেই ভারতীয়দের প্রবেশ ঘটছিল একটু একটু করে। কিন্তু এখানেও ইউনিয়ন
বোর্ড,
ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড থেকে লেজিসলেটিভ কাউন্সিল পর্যন্ত সর্ব
ক্ষেত্রেই ছিল সবর্ণ ভদ্রলোকেদের একচেটিয়া আধিপত্য। ফলে অনগ্রসর জাতিগুলিকে (‘ডিপ্রেসড ক্লাসেজ’) প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার জন্য ১৯১৯ সালে প্রথম বাংলার আইন পরিষদে একটি মনোনীত আসন
সৃষ্টি করা হয়। এর পর ১৯৩২-এ গান্ধীজি ও
আম্বেডকরের মধ্যে পুণা চুক্তি হওয়ার ফলে এই শ্রেণির জন্য
৩০টি আসন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়, যার বিরুদ্ধে সবর্ণ হিন্দু ভদ্রলোকেরা এক প্রবল প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। অনগ্রসর
শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতায়নের এই সুযোগের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন সে যুগের
অনেক বিশিষ্ট বাঙালি বুদ্ধিজীবী। কারণ দলিত-বহুজন সমাজের অভাব
-অভিযযোগের সঙ্গে এঁদের যোগ ছিল খু সামান্যই।
কিন্তু তাঁদের প্রতিবাদ গ্রাহ্য হয়নি, ১৯৩৫-এর ভারত সরকার আইনে ৩০টি আসন তফশিলি
জাতির জন্য সংরক্ষিত হয়। ১৯৩৭-এর নির্বাচনে এই ত্রিশটির মধ্যে মাত্র
সাতটি আসন পেয়েছিল কংগ্রেস। তেইশটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন কংগ্রেস-বিরোধী
নির্দল প্রার্থীরা।
আইনসভায় গিয়ে এঁরা মুসলিম লীগ-কৃষক
প্রজা পার্টির সরকারকে সমর্থন করেন। এই দলিত-মুসলিম জোট হয়ে দাঁড়ায় কংগ্রেস ও তার
সবর্ণ নেতৃত্বের সরকারি ক্ষমাতা লাভের পথে এক বিরাট বাধাস্বরুপ।
১৯৪০-এর দশকে বাংলায় তফশিলি জাতির আন্দোলন দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের নেতৃত্বে
প্রতিষ্ঠিত হয় আম্বেডকরপন্থী তফসিলি জাতি ফেডারেশন। অন্য দিকে, প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের মতো অনেক নেতা যোগ দেন কংগ্রেসে। ভারত ছাড়ো
আন্দোলন দেশভাগের যে জোয়ার এনেছিল এবং
দেশভাগের রাজনীতি যে বিভাজন সৃষ্টি করেছিল, তার প্রভাব পড়ে ১৯৪৮-এর নির্বাচনে। ত্রিশটি সংরক্ষিত আসনের মধ্যে চব্বিশটিতে
জয়ী হয় কংগ্রেসি তফসিলি নেতারা। মাত্র একটি আসন পায় তফসিলি ফেডারেশন, আর একটি তাঁদের সহযোগী রাজবংশী ক্ষত্রিয় সমিতি। স্বাভাবিক
ভাবেই দলিত প্রতিবাদী আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশভাগের রাজনীতি এই আন্দোলনকে আরও গৌণ করে তোলে।
দেশভাগের পর দলিত সম্প্রদায়ের এক বিরাট অংশ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে গেলেন। উদ্বাস্তু হয়ে যাঁরা এলেন ১৯৫০-এর দশকে, তাঁদের অনেককেই আন্দামান কিংবা দণ্ডকারণ্যে পুনর্বাসন দেওয়া
হল। পুনর্বাসন এবং নাগরিকত্ব আদায়ের সংগ্রামেই ব্যস্ত বইলেন এই সমস্ত উদ্বাস্তু দলিত মানুষ। পশ্চিমবঙ্গে দলিত-মুসলিম
রাজনৈতিক জোটের সম্ভাবনা আর রইল না। সবর্ণ হিন্দু ভদ্রলোকের সামাজিক-রাজনৈতিক
ক্ষমতা হল নিরঙ্কুশ ও বিপদ্মুক্ত। বর্ণবৈষ্ম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্তিমিত
হয়ে গেল। সবাই ভাবলেন জাতপাত চলে গিয়েছে।
কিন্তু আসলে স্বাধীনতা-উত্তর যুগে পশ্চিমবঙ্গে মূলস্রোতের সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বই
কেন্দ্রীভূত হল সবর্ণ ভদ্রলোকদের হাতে। ১৯৪৬ থেকে দলি সম্প্রদায়ের অনেক নেতাকে কংগ্রেস
তার নীচের তলার নেতৃত্বে অংশীদার করে তাঁদের প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়। ১৯৫২
থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত অধিকাংশ তফসিলি জাতির বিধায়ক ছিলেন কংগ্রেসের সদস্য, যার ব্রাহ্মণ
নেতৃত্ব এই শ্রেণির মানুষের দুঃখ-দুর্দশা সম্বন্ধে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন বলে প্রমাণ
নেই। তাই শেষ পর্যন্ত এই অবহেলার প্রতিবাদে ১৯৬৪-তে প্রমথরঞ্জল ঠাকুর বাধ্য হলেন কংগ্রেস
থেকে ইস্তফা দিতে।
অন্য দিকে বামপন্থীরা
জাতপাতের চাইতে শ্রেণি বৈবমোর উপরেই জোর দিয়েছেন বেশি। কিন্তু বর্ণবৈষম্যের সমস্যা তাতে দূর হয়নি। তেভাগা র উদ্বাস্তু
আন্দোলনে অনেক দলিত কৃষক ও উত্তান্ত যোগ দিলেও, কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তাঁদের উপস্থিতি ছিল সীমিত।
১৯৭৭-এর পর দলিত-বহুজন ভোটার ঝুঁকেছিলেন বামফ্রন্টের দিকে। এই আমলে পঞ্চায়েত
ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু দলিত নেতা স্থান পেয়েছেন নেতৃত্বের বাহিরবৃত্তে। তবে কান্তি বিশ্বাসের মতো দু’-একজন যাঁরা শীর্ষ নেতৃত্বে উঠতে পেরেছিলেন, তাঁরা তাঁদের বিড়ম্বনার অভিজ্ঞতা বলে গিয়েছেন নিজমুখেই। আর
এই সময়ে সংরক্ষণ নীতিও যে ঠিক ভাবে বাস্তবায়িত হয়নি তারও অনেক রিপোর্ট আমরা
দেখেছি।
জাতপাতের সমস্যা যে অদৃশ্য হয়নি, ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি তা আবিষ্কার করে। কারণ
দলিত-বহুজন সমাজের এক বিরাট অংশ তত দিনে আধার সংগঠিত হয়েছেন মতুয়া মহাসঙ্ঘের নেতৃত্বে। অতএব এঁদের ভোটব্যাঙ্ক হিসাবে আত্মসাৎ করার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু হল।
প্রথম রাউন্ডে জেতে তৃণমূল। দেখাদেখি ২০১১ এবং ২০২১-এর
নির্বাচনে বিজেপিও শামিল হল, এই প্রতিযোগিতায়। দলিত ভোট ভাগ হল।। কিন্তু উপকার কতটা হল তাঁদের!
এই নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় সব দলই অনেক প্রতিশ্রুতি দিল, তার কতটা পূরণ হয়েছে নির্বাচকরাই তা বলবেন। ক্ষমতার সুষম বণ্টন কতটা হল সেটা একটু দেখা যেতে পারে। ২০০৬ থেকে ২০২১-এ পশ্চিমবঙ্গে চারটি মন্ত্রিসভায় তফসিলি জাতির প্রতিনিধিত্বের অনুপাত ছিল যথাক্রমে ১৬.৬৬%, ৬%, ১০% এবং ১৪.৮৩%, যা জনসংখ্যায় তাঁদের অনুপাতের (২৩.৫১%) চাইতে অনেক কম। আবার এই মন্ত্রীদেরও অনেকেই রাষ্ট্রমন্ত্রী! স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরেও ক্ষমতাবন্টনের ছবি বলে দেয়, জাত-সমস্যা বাঙালি সমাজ থেকে মোটেই দূর হয়নি।


Comments
Post a Comment