বুদ্ধ, হরিচাঁদ ও আম্বেদকরের আন্দোলন: একটি ঐতিহাসিক ও
আদর্শিক যোগসূত্র
লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়
(মূল লেখাটিকে Ai দিয়ে সম্পাদিত করা হয়েছে) মতুয়া আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে একটি প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপিত
হয়—মতুয়া আন্দোলনের সঙ্গে গৌতম বুদ্ধ এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের সম্পর্ক কোথায়? কেন তাঁদের একই ধারার আলোচনায় যুক্ত করা হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিষয়টিকে কেবল ধর্মীয় বা আবেগগত দৃষ্টিকোণ
থেকে নয়, বরং ইতিহাস, সমাজচিন্তা ও আন্দোলনের ধারাবাহিকতার আলোকে বিশ্লেষণ
করতে হবে। কারণ, প্রতিটি
আন্দোলনের পেছনে যেমন একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে, তেমনি থাকে তার অস্তিত্ব, বিকাশ ও উত্তরাধিকারের প্রশ্ন।
এই আলোচনায় প্রবেশের আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অনেকের মনে হতে
পারে যে মতুয়া ধর্মকে বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাস্তবে
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য তা নয়। এখানে কেবল ইতিহাস, গ্রন্থসূত্র ও বিভিন্ন চিন্তাধারার মিল-অমিলের
ভিত্তিতে একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। গ্রহণ বা বর্জন সম্পূর্ণরূপে পাঠকের
নিজস্ব বিবেচনার বিষয়।
হরিচাঁদ ঠাকুর ও বুদ্ধের আদর্শ:-
মতুয়া দর্শনের সঙ্গে বুদ্ধের সম্পর্ক অনুধাবন করতে হলে প্রথমেই ‘শ্রীশ্রী
হরিলীলামৃত’ গভীরভাবে পাঠ করা প্রয়োজন। গ্রন্থটির এর ১৫ পৃষ্ঠায়
“শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের জন্মবিবরণ” অংশে উল্লেখ আছে—
“বুদ্ধের কামনা তাহা পরিপূর্ণ জন্য,
যশোমন্ত
গৃহে হরি হৈল অবর্তীণ।”
এই
পংক্তির অর্থ হলো—বুদ্ধের অপূর্ণ কামনাকে পূর্ণতা দেওয়ার উদ্দেশ্যে হরিচাঁদ
ঠাকুরের আবির্ভাব।
এখানে
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে—বুদ্ধের সেই কামনা কী ছিল?
বুদ্ধের
আদর্শের কেন্দ্রে ছিল মানবমুক্তি, সমতা, মৈত্রী, ন্যায় ও কল্যাণ। তিনি তাঁর ভিক্ষুদের উদ্দেশে
বলেছিলেন—
“বহুজন হিতায়, বহুজন
সুখায়।”
অর্থাৎ
ধর্ম হবে কেবল বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর জন্য নয়; তা হবে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ ও সুখের জন্য।
অন্যদিকে
মতুয়া দর্শনে আমরা দেখি—
“জীবে দয়া, নামে
রুচি, মানুষেতে নিষ্ঠা।
ইহা
ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।" (শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত ১ম
প্রকাশ, পৃ. ১১)
এখানেও
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা
এবং মানবকেন্দ্রিক চেতনার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে দেখা যায়, বুদ্ধের মানবমুখী দর্শন এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের মতুয়া
দর্শনের মধ্যে একটি মৌলিক আদর্শিক সাদৃশ্য বিদ্যমান।
বুদ্ধের দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল—সমতা, স্বাধীনতা, মৈত্রী ও
ন্যায়।
মতুয়া দর্শনের ভিত্তি—সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা।
শব্দের
ভিন্নতা থাকলেও উভয়ের লক্ষ্য মানবকল্যাণ ও সামাজিক বৈষম্যের অবসান। এই কারণেই
অনেক গবেষকের মতে, হরিচাঁদ ঠাকুর তাঁর সময়ের সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে বৌদ্ধধর্মের মানবিক
আদর্শকে নতুন রূপে উপস্থাপন করেছিলেন।
কেন মতুয়া আন্দোলনের প্রয়োজন হয়েছিল?
বাংলার
ইতিহাসে পালযুগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন এবং
দীর্ঘকাল বাংলায় বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিকশিত হয়েছিল।
‘গুরুচাঁদ চরিত’-এ উল্লেখ রয়েছে—
“পালবংশ মহাতেজা বঙ্গদেশে যবে রাজা,
বৌদ্ধ
ধর্ম আসিল এদেশে।
বৌদ্ধ
রাজধর্ম মানি বঙ্গবাসী যত প্রাণী,
বৌদ্ধ
ধর্মে দীক্ষা নিল শেষে।।" (পৃষ্ঠা নং ২৮ ,পঞ্চম সংস্করণ ২০০৯ )
কিন্তু পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক রূপান্তর এবং ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব বিস্তারের ফলে বাংলার
সমাজব্যবস্থায় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে অবহেলিত ও বঞ্চিত
জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য একটি নতুন সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়া আন্দোলনের সূচনা করেন।
তিনি
সন্ন্যাসের পরিবর্তে গার্হস্থ্য জীবনের মধ্যেই ধর্মচর্চার কথা বলেন এবং ঘোষণা
করেন—
“হাতে কাম, মুখে নাম।”
অর্থাৎ
কর্ম ও নৈতিক জীবনই হবে ধর্মচর্চার প্রধান ভিত্তি।
আম্বেদকর ও মতুয়া আন্দোলনের সংযোগ:-
এবার প্রশ্ন আসে—ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের সঙ্গে মতুয়া আন্দোলনের সম্পর্ক
কোথায়?
১৯৩৫
সালে আম্বেদকর ঘোষণা করেছিলেন—
“আমি হিন্দু হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছি, কিন্তু হিন্দু হিসেবে মৃত্যুবরণ করব না।”
পরবর্তীকালে
১৯৫৬ সালে তিনি ‘বৌদ্ধধম্ম’ গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, সামাজিক বৈষম্য, অস্পৃশ্যতা
ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য মানবিক ও যুক্তিনির্ভর ধর্মীয় দর্শনের
প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে
হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরও সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত ও তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে
তুলেছিলেন। ফলে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিক থেকে উভয় আন্দোলনের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট
সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন ও সাংবিধানিক অগ্রগতিঃ-
হরিচাঁদ ঠাকুরের সূচিত আন্দোলনকে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন গুরুচাঁদ
ঠাকুর। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়। তাই
তিনি শিক্ষা আন্দোলনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন।
এই
ধারাকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদান করেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। তাঁর ঐতিহাসিক
ভূমিকার ফলেই ড. আম্বেদকর গণপরিষদে প্রবেশের সুযোগ লাভ করেন এবং পরবর্তীতে ভারতের
সংবিধান প্রণয়নের নেতৃত্ব দেন।
সংবিধানের
মাধ্যমে তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি জনজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) জন্য যে সাংবিধানিক সুরক্ষা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা সামাজিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী
পদক্ষেপ।
ফলে হরিচাঁদ ঠাকুরের সামাজিক আন্দোলন, গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং ড. আম্বেদকরের সাংবিধানিক
নেতৃত্ব—সবকিছুই একটি বৃহত্তর মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত
হতে পারে।
উপসংহার
ঐতিহাসিক ও আদর্শিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বুদ্ধ, হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুর, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল এবং ড. বি. আর. আম্বেদকর—প্রত্যেকে তাঁদের নিজ নিজ সময়ে
অবহেলিত মানুষের অধিকার, মর্যাদা
ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন।
তাঁদের
আন্দোলনের ধরন ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল এক—মানুষের মুক্তি, সামাজিক ন্যায়, শিক্ষা, আত্মমর্যাদা
ও সমতার প্রতিষ্ঠা।
তাই এই মহান ব্যক্তিত্বদের অবদানকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং একটি দীর্ঘ সামাজিক জাগরণ ও মানবমুক্তির
ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁদের প্রদর্শিত আদর্শ অনুসরণ
করে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করাই হতে পারে তাঁদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা
নিবেদনের সর্বোত্তম উপায়।

Comments
Post a Comment