Skip to main content

শিক্ষার আলোকবর্তিকা গুরুচাঁদ ঠাকুর: তিনি কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছেন? না কি সঙ্গে অন্য কিছুর কথাও বলেছেন? লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়

 


শিক্ষার আলোকবর্তিকা গুরুচাঁদ ঠাকুর:
তিনি কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছেন? না কি সঙ্গে অন্য কিছুর কথাও বলেছেন?

লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়

     বাংলার পিছিয়ে পড়া মানুষের মুক্তির ইতিহাসে গুরুচাঁদ ঠাকুর এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি কেবল একজন ধর্মীয় বা সামাজিক নেতা ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী শিক্ষা-সংস্কারক। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শৃঙ্খলমুক্তির প্রধান হাতিয়ার।

১. সত্য উপলব্ধি ও সংগ্রামের ভিত্তি: সঠিক শিক্ষা

     গুরুচাঁদ ঠাকুর অনুধাবন করেছিলেন, তৎকালীন বাংলায় অনুন্নত শ্রেণির মানুষের বঞ্চনার মূল কারণ হলো 'অজ্ঞতা'অশিক্ষার অন্ধকারকে পুঁজি করেই কতিপয় সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের ওপর শোষণ ও নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাত। যে সমাজে অস্পৃশ্যদের বিদ্যালয়ের আঙিনা স্পর্শ করা ছিল কল্পনাতীত, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করলেন—শিক্ষা ছাড়া মানুষ কখনও প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে না।”

সত্যকে না জানলে অধিকার সচেতন হওয়া সম্ভব নয়, আর সচেতন না হলে সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলা অসম্ভব। এই লক্ষ্যেই ১৮৮০ সালে তিনি নিজ বাসভবনে একটি পাঠশালা স্থাপন করেন, যা ছিল বাংলার পিছিয়ে রাখা সমাজের জন্য শিক্ষার প্রথম সূর্যোদয়।

২. “বিদ্যাহীন জন, পশুর সমান”: শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রতিজ্ঞা

গুরুচাঁদ ঠাকুরের কাছে বিদ্যা ছিল পরম ধর্ম। তিনি মনে করতেন, ধন-মান-প্রাণ বিসর্জন দিয়ে হলেও শিক্ষার আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত রাখতে হবে। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল অদম্য প্রত্যয়:

আমাদের ধন-মান এমনকি প্রাণ চলে গেলেও ক্ষতি নেই; সব কিছুর বিনিময়ে আমরা এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে রুদ্ধ হতে দেব না।”

পিতা হরিচাঁদ ঠাকুরের আদর্শকে পাথেয় করে তিনি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছাতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত সমাজই পারে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে। তাই তিনি সমাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন—যিনি শিক্ষিত, তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং শিক্ষাকেই করতে হবে সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।

৩. শিক্ষার প্রসারে আপসহীন সংগ্রাম

গুরুচাঁদ চরিতের অমর বাণী আজও আমাদের শিহরিত করে:

খাও বা না খাও তা’তে কোন দুঃখ নাই। / ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই আমি চাই।।”

তিনি অশিক্ষাকে একটি ‘মারণ ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তাঁর মতে, অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো জ্ঞানের আলো। তিনি বলতেন, মুক্তি চাইলে বিদ্যান হতে হবে; কারণ বিদ্যাই হলো সেই অমূল্য ধন যা জীবনের সকল দুঃখ নিবারণ করে চিরসুখী করতে পারে।

৪. নারী শিক্ষার অগ্রদূত

বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই গুরুচাঁদ ঠাকুর নারী-পুরুষের সমঅধিকারের কথা প্রচার করেছিলেন। ১৯৩২ সালে ওড়াকান্দিতে ‘হরি-গুরুচাঁদ মিশন’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নারী শিক্ষার প্রসারে জোয়ার আনেন। নিজ মাতা ও স্ত্রীর স্মরণে প্রতিষ্ঠা করেন শান্তি-সত্যভামা’ বিদ্যালয়। তিনি জানতেন:

বালক বালিকা দোঁহে পাঠশালে দাও। / লোকে বলে মা’র গুণে ভাল হয় ছাও।।”

অর্থাৎ, একটি শিক্ষিত মা-ই পারেন একটি শিক্ষিত ও উন্নত জাতি উপহার দিতে।

৫. তিনি কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছেন? না কি সঙ্গে অন্য কিছুর কথাও বলেছেন?

    তিনি কেবল প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রথাগত শিক্ষার (Academic Education) কথা বলেননি। তাঁর দর্শনে সামাজিক শিক্ষা’ (Social Education) এবং আত্ম-উপলব্ধি’ ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক শিক্ষা, যা মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, কুসংস্কার ও শোষণ থেকে মুক্তি দেবে এবং আত্মমর্যাদার সাথে সমাজ সংস্কারে উদ্বুদ্ধ করবে। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক হাতিয়ার।

বিপ্লবের রসদ: কেবল ডিগ্রি অর্জন মানসিক প্রগতি আনে না। অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষও কুসংস্কার ও ব্রাহ্মণ্যবাদী চক্রান্তের জালে আটকা পড়ে থাকেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যখন ‘সামাজিক শিক্ষা’ বা ‘চেতনা’ যুক্ত হয়, তখনই জন্ম নেয় বিপ্লব।

  • আত্ম-উপলব্ধি: জোতিরাও ফুলে বা গুরুচাঁদ ঠাকুরের মতো মহাপুরুষেরা হয়তো বর্তমান যুগের মতো উচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারী ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের ‘সামাজিক শিক্ষা’ ছিল প্রখর। তাঁরা সমাজের বর্ণবৈষম্য ও কূটকৌশলকে আত্ম-উপলব্ধি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন।
  • আম্বেদকরের আদর্শ: স্বয়ং ড. বি. আর. আম্বেদকর বিশ্বের অন্যতম উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি হয়েও মাধ্যমিক পাস মহাত্মা জোতিরাও ফুলেকে নিজের গুরু মেনেছিলেন তাঁর ‘সামাজিক শিক্ষা’ ও দর্শনের কারণে।

মূল্যায়ন ও উপসংহার

শিক্ষা সম্পর্কে গুরুচাঁদ ঠাকুরের দর্শনের মূল নির্যাস হলো:

  1. সামাজিক পরিবর্তন: পুঁথিগত বিদ্যা না থাকলেও সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব।
  2. আত্ম-উপলব্ধি: অধিকার আদায়ের জন্য নিজের অবস্থান ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
  3. সংগ্রাম: সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করতে নিরন্তর সংগ্রাম ও বিপ্লবের মানসিকতা প্রয়োজন।

Comments