শিক্ষা সম্পর্কে গুরুচাঁদ ঠাকুর। তিনি কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছেন? না কি সঙ্গে অন্য কিছুর কথাও বলেছেন? লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়
শিক্ষা সম্পর্কে গুরুচাঁদ ঠাকুর। তিনি কি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছেন? না কি সঙ্গে অন্য কিছুর কথাও বলেছেন?
লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়
(আমার বই- ‘গুরুচাঁদ ঠাকুরের
শিক্ষা আন্দোলন’ থেকে তুলে দিলাম।)
সঠিক শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত সত্য জানতে সাহায্য করেঃ-
গুরুচাঁদ
দেখেন, এই বাংলার মধ্যে যারা অনুন্নত জাতির লোক আছে তাদের কাছে শিক্ষা বিষয়টা
হচ্ছে গভীর অন্ধকারময়। সকলে অশিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে দুঃখ ভোগ করছে। এদের
অশিক্ষার সুযোগ নিয়ে সকলে এদেরকে প্রতিনিয়ত শোষণ করে চলেছে, অধিকার বঞ্চিত করে
চলেছে। তৎকালীন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যাদের স্কুলের দরজা দেখার
অধিকার ছিল না, সাধারণের জলাশয় থেকে যাদের জলপানের অধিকার ছিল না, তাদের
ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাবে একথা ভাবাও যেন পাপ! কিন্তু গুরুচাঁদ ঠাকুর জানতেন শিক্ষা
ছাড়া মানুষ কখনও প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে না। আর এই
প্রকৃত সত্যকে জানতে না পারলে কোন দিনও তারা অত্যাচারীদের অত্যাচার বন্ধ করার জন্য
সংঘবদ্ধ আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারবে না। একমাত্র সঠিক শিক্ষাই মানুষকে প্রকৃত
সত্য জানতে সাহায্য করে ও শক্তিশালী হতে
সাহায্য করে । তাই ১৮৮০ সালে তিনি নিজের বাড়িতেই প্রথমে পাঠশালা
স্থাপন করে শিক্ষা দানের মত মহৎ কাজ শুরু করেন। যে পাঠশালা
হল বাংলায় পিছিয়ে রাখা সমাজের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
আমাদের
ধন মান এমনকি প্রাণ চলে গেলেও ক্ষতি নেই; সব কিছুর বিনিময়ে আমরা এদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুতেই রুদ্ধ হ’তে দেবনা। আমরা আমাদের সমাজেরই
সুশিক্ষিত শিক্ষক পেয়েছি। তাই এখন তিনি আমাদের সন্তানদেরকে নিজের সন্তানের মত করে
শিক্ষা দেবেন। আমাদের আর কোন ভয় নেই, কোন দুঃখ নেই।
বিদ্যাই আমাদের ধর্ম কর্ম এবং
সব কিছুঃ-
আমার
বাবা হরিচাঁদ, আমাকে আদেশ দিয়ে গেছেন আমাদের প্রতিটি ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে
দেওয়ার জন্য। আপনারা ভেবে দেখুন, বিদ্যা না থাকলে সব কিছুই বৃথা হয়ে যায়। আর
বিদ্যা অর্জন করতে পারলে ধন মান সব কিছুই পাওয়া যাবে। তাই ভাইসব আপনারা শুনুন, এই
বিদ্যা অর্জন করতে না পারলে কিন্তু ধন মান সব কিছুই বৃথা হয়ে যাবে। আপনারা যদি
মানুষ হয়ে মানুষের মত বাঁচতে চান, তাহলে
এই বিদ্যা অর্জন করতে গিয়ে যদি জীবন বলিদানও করতে হয় সেটাও ভাল। তবু এই বিদ্যা
অর্জনের কাজে যেন কোন প্রকার অসুবিধা না হয় সেটা লক্ষ রাখবেন। আমি আপনাদের আর একটা
কথা বলছি, যারা অবিদ্যান থাকবেন, তাদেরকে কেউ আপন জন বলে মনে করবেন না।
যিনি শিক্ষা অর্জন করেছেন তাকে যথোপযুক্ত
সম্মান প্রদান করবেন। শিক্ষাকে ভিত করে আপনারা আপনাদের সমাজটাকেও গড়ে তুলুন। তাই
আমাদের সকলের একটাই মন্ত্র হবে, সেটা হচ্ছে; বিদ্যাই আমাদের ধর্ম কর্ম এবং
সব কিছু। এছাড়া অন্য কিছুর কোন
গুরুত্ব নেই। জীবনকে বাজি রেখে আমাদের এই বিদ্যা অর্জনের কাজকে ত্বরান্বিত করতে
হবে। আপনারা এতক্ষণে আশা করি বুঝতে পেরেছেন যে, বিদ্যাহীনের কোন মূল্য নেই। তাই
আমি বার বার একটা কথাই আপনাদের বিল যে, যেকোন প্রতিকুল পরিস্থিতিকে অতিক্রম করে
আপনারা নিজেরা যেমন বিদ্যা অর্জনে আগ্রহী হবেন, তেমনি এর গতিকে অব্যাহত রাখাও
আপনাদের দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব আপনারা প্রাণকে বাজি রেখে পালন করবেন।”
শিক্ষার
প্রসারঃ-
আমি তোমাদের সবাইকে বলছি যদি তোমরা আমাকে মানো তাহলে-
“খাও বা না খাও তা’তে কোন দুঃখ
নাই।
ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই আমি
চাই”।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৪৪
“তোমরা খেতে পাও বা না পাও তার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই।
কিন্তু অবিদ্যান সন্তান যেন তোমাদের ঘরে না থাকে। তোমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে
তুলবে, এটাই আমার একমাত্র আশা।”
তিনি
বুঝতে পেরেছিলেন অশিক্ষা হচ্ছে মারণ রোগ। তার জন্য তিনি বলেন,
অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে এই দেশ।
জ্ঞানের আলোকে ব্যাধি তুমি কর শেষ।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ
১৩৭
হ্যাঁ,
তুমি যদি এই অজ্ঞানতার ব্যাধি থেকে মুক্ত হ’তে চাও তাহলে তুমি একমাত্র জ্ঞানের
আলোদিয়েই এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে। আর তার জন্য তোমাকে বলি-
তাই বলিভাই
মুক্তি যদি চাই
বিদ্যান হইতে
হবে।
পেলে বিধ্যাধন
দুঃখ নিবারণ
চির সুখি হবে
ভবে।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৩০
যে
মহামানবের ভাবনা এত উচ্চমানের সেই মহামনব হচ্ছেন শিক্ষার অগ্রদূত গুরুচাঁদ ঠাকুর।
তাঁর সম্পর্কে প্রথমে সংক্ষিপ্তভাবে জেনে নেওয়া দরকার।
আমি আমার পিতার কাছে অনেক বার শুনেছি যে, নারী পূরুষদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করা যাবেনা। উভয়ে সমান অধিকার পাবে। অর্থাৎ পুরুষ যে অধিকার পাবে নারীও সেই অধিকার সমানভাবে পাবে।
নারী শিক্ষাঃ-
১৯৩২ সালে
ওড়াকান্দীতে ‘হরি-গুরুচাঁদ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করে সেই মিশনের সহায়তায় ওড়াকান্দীর তালতলায় নারী শিক্ষার
জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।
নারী শিক্ষাতরে প্রভু আপন আলয়।
‘শান্তি-সত্যভামা’ নামে স্কুল গড়ে
দেয়।। গুরুচাঁদ চরিত পৃ.৫৮৭
‘শান্তি-সত্যভামা’
(শান্তি-গুরুচাঁদ ঠাকুরের মা, আর সত্যভামা-গুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবন সঙ্গীনী) নামে
একটা আলাদা বিদ্যালয়ের স্থাপন করেন।
তিনি বলেন, বালক বালিকা দোঁহে পাঠশালে দাও।
লোকে বলে “মা’র গুণে ভাল হয় ছাও”।। -গুরুচাঁদ চরিত পৃঃ ৫২৯
অর্থাৎ, ছেলে মেয়ে উভয়কে শিক্ষা অর্জনের জন্য স্কুলে পাঠাতে
হবে। বিশেষ করে নারীদের উপর শিক্ষার জন্য জোর দিতে হবে। কারণ, ‘মা’ যদি শিক্ষিত
হন, তাহলে তার গুণে সন্তানও ভাল হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সামাজিক শিক্ষার একান্ত দরকারঃ-
সাধারণভাবে শিক্ষা হচ্ছে দু’প্রকার। প্রথাগত
শিক্ষা (Academic Education) এবং সামাজিক
শিক্ষা (Social Education)। গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা
আন্দোলনকে (১৮৮০ থেকে ১৯৩৭ সাল) বর্তমান কাল পর্যন্ত সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যদি পিছন ফিরে তাকাই, তাহলে
দেখতে পাবো অবিভক্ত ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলে ব্রাহ্মণ্যবাদের চক্রান্তে
পিছিয়ে পড়া সমাজের মহামানবেরা যুগান্তকারী পরিবর্তন করেছেন। যার ফলে সামজিক ও
অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেক প্রগতি হয়েছে।
কিন্তু এই প্রগতির মূল কারণ হচ্ছে- Academic Education. প্রথাগত বিদ্যার সাথে সামাজিক
শিক্ষার সংযোগ হলে বিপ্লব হয়। শুধু
প্রথাগত বিদ্যাতে মানসিক প্রগতি লাভ করা
যায় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে বহু উচ্চশিক্ষিত
উচ্চপদাধিকারিরা নিজের প্রগতির কথাই ভেবে যায় সারা জীবন, তারা সম্পূর্ণভাবে
ব্রাহ্মণ্যবাদের জালে নিজেকে আষ্টে-পৃষ্টে আরো জড়িয়ে ফেলে । তারা মন্দিরে মন্দিরে
গিয়ে ব্রাহ্মণ দিয়ে পূজাও করায় এবং পূজার পর বিগ্রহের সাথে সাথে অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত
পূজারীকেও প্রণাম করে। বাবাসাহেব সর্বকালের সর্বোচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও প্রথাগত
শিক্ষায় মাত্র মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্ত
কিন্তু সামাজিক শিক্ষায় বিশেষ শিক্ষিত মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে কে নিজের গুরু
করেছিলেন। বাংলাতেও গুরুচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনের ফলে শিক্ষা ক্ষেত্রে
ও সমাজের প্রগতির ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
সারা ভারতবর্ষে যে পরিবর্তন ঘটেছে, সেই
পরিবর্তনকারী বা ক্রান্তিকারীদের মধ্যে বাবা
সাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকর হচ্ছেন সর্বাধিক উচ্চ শিক্ষিত। বাকী প্রায় সকলেই
অল্পশিক্ষিত বা Academic Education গ্রহণ করতে
পারেননি। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হচ্ছে যাঁরা অল্প শিক্ষিত বা শিক্ষাঙ্গনের দোর
গোড়ায় প্রবেশ করেননি বা তাঁদের সময় প্রবেশাধীকার ছিলনা; তাসত্বেও এই মহামানবেরা
সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছিলেন। আর সেই সামাজিক শিক্ষা কিন্তু কোন শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়না। সেই মহামানবেরা তৎকালীন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আত্ম-উপলব্ধির
মাধ্যমে সমাজ দর্শনের শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সমাজের মধ্যে যে ব্রাহ্মণ্যবাদী কুট
কৌশলের ফলে মানুষকে জাত-ব্যবস্থায় বিভক্ত করে নিচ্ করে রেখেছিল। মানুষকে পশুর
সমতুল্য করে তুলেছিল, সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ছিল; এ’সব কিছু তাঁরা আত্ম
উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। যার ফলে তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অধিকার আদায়ের জন্য
সংগ্রাম করেছিলেন।
শিক্ষা
সম্পর্কে মূল্যায়ণঃ-
(1)
প্রথাগত শিক্ষা না থাকলেও সামাজিক
শিক্ষায় শিক্ষিত হলে সমাজের পরিবর্তন মূলক কাজ করা যায়।
(2)
সামাজিক পরিবর্তন মূলক কাজ করার জন্য
আত্ম উপলবদ্ধির দরকার।
(3)
সমাজের প্রতি অনুরাগী হওয়া দরকার।
(4)
সমাজে বিপ্লব আনার জন্য সংগ্রাম করা
দরকার।
এই শিক্ষা বিষয়ক লেখার আপাতত ইতিটানতে চাই বাবা সাহেব ড. ভীমরাও
আম্বেদকরের এই বাণীটি দিয়ে, THOSE WHO DON’T KNOW THEIR HISTORY,
CAN NOT MAKE HISTORY. যে
জাতি বা সমাজ তার ইতিহাস জানেনা, সে জাতি বা সমাজ ইতিহাস নির্মাণ করতে পারেনা। তাই
এই লেখা সমাজের সঠিক ইতিহাস জানানোর জন্য,
যাতে আগামীদিনে নিজেদের ইতিহাস নিজেরাই নির্মাণ করা যায়। আর
মহামানবদের চালানো আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়া যায়।

Comments
Post a Comment