গুরুচাঁদ ঠাকুর কি শুধু নমঃশূদ্রদের জন্য কাজ করেছেন? নাকি সেটা সমগ্র জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের কল্যাণের জন্য? তাহলে তাঁকে কেন একটা জাতির মধ্যে গন্ডিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে? আসুন গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাণী ও কর্মধারার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়
গুরুচাঁদ ঠাকুরের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার আন্দোলন। তাই তিনি জীবনের
উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রথমেই ঘোষণা করেন-
“খাও বা না খাও তা’তে কোন দুঃখ নাই।
ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই
আমি চাই”।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৪৪
ছেলে মেয়েকে দিতে শিক্ষা
প্রয়োজনে করিবে ভিক্ষা।
অর্থাৎ আপনি পেটের খুদা মিটাতে সক্ষম কি না
সেটা আমার কাছে বড় প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হচ্ছে আপনার সন্তানদেরকে শিক্ষিত করে তোলা। আর এর জন্য
আপনাকে প্রয়োজনে ভিক্ষা করতে হলেও করবেন। কিন্তু সন্তানকে অশিক্ষিত করে রাখবেন না।
এবার বলুন তো এই কথা কি কোন বিশেষ
সম্প্রদায়ের জন্য? নাকি
বিশ্বের সকল মানুষদের শিক্ষিত করার জন্য এই উদাত্ব আহ্বান?
তিনি অশিক্ষাকে মারণ ব্যধির সঙ্গে তুলনা করে
বলেছেন-
অজ্ঞান ব্যাধিতে ভরা আছে
এই দেশ।
জ্ঞানের আলোকে ব্যাধি তুমি
কর শেষ।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৩৭
অর্থাৎ এই অজ্ঞানতার ব্যাধিতে দেশ ভরে আছে।
একমাত্র জ্ঞানের আলো দিয়েই এই অজ্ঞানতাকে দূর করা যাবে।
মানুষ সব সময় মুক্তির সন্ধান করে। গুরুচাঁদ
ঠাকুর মানুষের এই মুক্তি লাভের জন্য বলেছেন-
তাই বলিভাই মুক্তি যদি চাই
বিদ্যান হইতে হবে।
পেলে বিধ্যাধন দুঃখ নিবারণ
চির সুখি হবে ভবে।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৩০
মুক্তি এখানে কোন মুক্তি? মুক্তি হচ্ছে অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে বেরিয়া
এসে জ্ঞানের আলোতে মুক্তি। সেই মুক্তির জন্য আপনাদের বিদ্যান হতে হবে। তাহলে
মুক্তি পাবেন। আর সব দুঃখের নিবারণ ঘটবে। আপনি চির সুখি হ’তে পারবেন।
শিক্ষা অর্জনকে তিনি এত মহত্বপূর্ণ মনে
করেছেন,
যার জন্য তিনি বলেছেন-
বিদ্যা ছাড়া কথা নাই
বিদ্যা কর সার।
বিদ্যাধর্ম, বিদ্যাকর্ম, অন্য সব ছার।। -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১০৮
অর্থাৎ ধর্ম কর্ম সব কিছুর মূল হচ্ছে বিদ্যা।
বাকী সব গুরুত্বহীন। তাই সকলে এই অমূল্য সম্পদকে অর্জন করুন।
বলুন তো শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে আর ক’জন এরকম দীপ্ত ঘোষণা করেছেন? যে বিদ্যাই ধর্ম কর্ম ও সার। বাকী অন্য সব
অসার। তবুও কেন আমরা দেখতে পাই তাঁর এই বাণী প্রচার বিমুখতায় রুদ্ধ হয়ে আছে?
এবার দেখা যাক গুরুচাঁদ ঠাকুরের এই শিক্ষা
আন্দোলনের ভাগীদার কারা ছিলেন? আর তিনি কাদের জন্য কাজ করছেন-
শিক্ষা আন্দোলন যবে প্রভু
করে দেশে।
ভক্ত সুজন যত তার কাছে
আসে।।
নমঃশূদ্র তেলী মালী আর কুম্ভকার।
কপালী মাহিষ্য দাস চামার
কামার।।
পোদ আসে তাতী আসে আসে
মালাকার।
কতই মুসলমান ঠিক নাহি
তার।।
সাবাকে ডাকিয়া প্রভু বলে
এই বাণী।
“শুন সবে ভক্তগণ আমি যাহা
জানি।।
নমঃশূদ্রকুলে জন্ম হয়েছে
আমার।
তবু বলি আমি নাহি নমঃর
একার।।
দলিত পীড়িত যারা দুঃখে
কাটে কাল।
ছুঁস্নে ছুঁস্নে বলে যত
জল-চল।।
শিক্ষা-হারা দীক্ষা-হারা
ঘরে নাহি ধন।
এই সবে জানি আমি আপনার
জন।।” -গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ১৪৪
এই শিক্ষার আন্দোলন যখন গুরুচাঁদ ঠাকুর শুরু
করেন তখন ঠাকুরকে যারা শ্রদ্ধা করতেন বা তাঁর কথা মেনে চলতেন এরকম বিভিন্ন জাতির
লোকেরা ঠাকুরের কাছে আসতেন; যেমন- তেলী, মালী কুম্ভকার, কাপালী, মাহিষ্য, দাস, চামার, কামার, পোদ (পৌন্ড্র), তাতী, মালাকার। এছাড়া অগণিত মুসলমানও ঠাকুরের কাছে আসতেন। এদের সবাইকে গুরুচাঁদ ঠাকুর বলতেন, “তোমরা আমাকে ভক্তি শ্রদ্ধা কর। কিন্তু আমি যা জানি
সেটা হচ্ছে, আমি জন্মগত কারণে নমঃ জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করলেও আমি
কিন্তু শুধু নমঃদের নই। আমি তাদের; যারা পদদলিত, পীড়িত, অত্যাচারিত, যাদের সব সময় দুঃখ-কষ্ট
নিয়ে জীবন কাটাতে হয়। যাদেরকে দেখলে উচ্চবর্ণীয়রা অচ্ছুৎ বলে ঘৃণা করে। যাদের পেটে
খাবার নেই। শিক্ষার আলো যাদের মধ্যে পৌঁছায়নি। যাদের সহায় সম্বল বলে কিছুই নেই।
তারাই হচ্ছে আমার আপন জন।”
সমাজ নারীকে যখন পণ্যদ্রব্য মনে করে তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে; তাকে মানুষ নয়, নারী বলেই সামাজিক পণ্য হিসাবে গণ্য করে; সেরূপ সামাজিক সংকটের মূহুর্তে আমরা হরিচাঁদ ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের কি প্রতিফলন দেখতে পাই নারীদের সম্পর্কে?
শুনেছি পিতার কাছে আমি
বহুবার
নারী পুরুষ পাবে সম
অধিকার।।
সমাজে পুরুষ পাবে যেই
অধিকার।
নারীও পাইবে তাহা করিলে
বিচার।।
তিনি বলেন, আমি আমার পিতার কাছে অনেক বার শুনেছি যে, নারী পূরুষদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করা যাবেনা।
উভয়ে সমান অধিকার পাবে। অর্থাৎ পুরুষ যে অধিকার পাবে নারীও সেই অধিকার সমানভাবে
পাবে।
এবার বলুন তো সে যুগে দাঁড়িয়ে এরকম দৃপ্ত
কন্ঠে নারীর অধিকার নিয়ে ক’জনে ঘোষণা করেছেন? এ
সব কথা কি বিশ্বের সমস্ত নারীদের অধিকারের জন্য নয়?
একবার গুরুচাঁদ ঠাকুরের সংগ্রামের সাথী
অস্ট্রলিয়ান মিশনারী সি. এস. মীড্ সাহেবের জীবন সঙ্গীনী Alice Pappin, গুরুচাঁদ ঠাকুরের সামাজিক কর্ম-কান্ডে আপ্লুত
হয়ে,
অনুপ্রাণীত হয়ে তাঁকে ‘ধর্মপিতা’ বলে সম্বোধন করেন। তবে তিনি আবার গুরুচাঁদ
ঠাকুরের কাছে জানতে চান যে-
“আমি আপনাকে পিতা বলেছি, তাই আমি আপনার কন্যা। কিন্তু আমিতো অন্য
ধর্মের। তাই আপনি কি আমার হাতের খাবার খাবেন?”
তখন গুরুচাঁদ ঠাকুর জানান,
“শুন কন্যা, গুণে ধন্যা, আমার বচন।
জাতি-ভাগ মোর ঠাঁই পাবে না
কখন।।
নরাকারে ভূমন্ডলে যত জন
আছে।
‘এক জাতি’ বলে মান্য পাবে মোর কাছে।।
আমার পিতার ভক্ত আছে যত
জন।
এক জাতি বলে তারা হয়েছে
গণ।।
লোকাচারে তার কেহ কায়স্থ
ব্রাহ্মণ।
‘মতুয়ার’ মধ্যে তাহা নাহি নিরূপণ।।
নমঃশূদ্র, তেলী মালী, ব্রাহ্মণ কায়স্থ।
ইস্লাম, বৈদ্য জাতি-রোগে
সিদ্ধ-হস্ত।।
মতুয়া সকলে এক, জাতি-ভেদ নাই।
বিশেষতঃ কন্যা হ’লে নাহিক বালাই।। গুরুচাঁদ চরিত পৃঃ ২০০/২০১
অর্থাৎ “জাতিগত কারণে বা ধর্মীয় কারণে সে যে জাতি বা
ধর্মেরই হোক না কেন আমার কাছে তার কোন অস্তিত্ব পাবেনা কখনো। এই বিশ্বে যত লোক আছে, সকলে আমার কাছে ‘এক জাতি’ অর্থাৎ ‘মানব জাতি’ বলে গণ্য হবে। আমার পিতা ঠাকুর
হরিচাঁদের যত ভক্তরা আছেন; তাদেরকে সব
সময় এক জাতি বলেই গণ্য করা হয়েছে। যদিও তারা লোকাচারে কেউ ব্রাহ্মণ, কায়স্থ বা অন্য জাতির লোক। তবে এটা সত্য যে, বিভিন্ন জাতি বা ধর্মের লোকেরা নিজেদের মধ্যে
জাতিভেদ প্রথাকে প্রাধান্য দেয়। যার ফলে সমাজের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়। যেটা
একটা কঠিক সামাজিক ব্যাধি। তবে আবার বলি, মতুয়ারা সকলে একই জাতি। এখানে কোন ভেদাভেদ নেই। আর
অন্য জাতি বা ধর্মে যেমন নারীদেরকে মর্যাদা দেওয়া হয়না, কোন অধিকার দেওয়া হয়না, সেক্ষেত্রে মতুয়াধর্মের নিময়ানুসারে আমার
কাছে নারীরা সব মর্যাদা পাবেন, অধিকার পাবেন। তাদেরকে কখনো পৃথক দৃষ্টিতে দেখা হবেনা বরং
তাদের প্রগতির জন্য আমি আরো বেশি করে কাজ করব। যেখানে কোন রকম ভেদাভেদ বা জাতি
ধর্মের পরিচয় থাকবেনা।”
গুরুচাঁদ ঠাকুর জাতিভে সম্পর্কে আরো বলেছেন-
সামাজিক
নীতি সব শোন ভক্তজন।
‘জাতিভে্দ’ প্রথা
নাহি মানিবে কখন।।
শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত পৃ.৫৭০
গুরুচাঁদ ঠাকুর তাঁর অনুয়ায়ীদেরকে কঠোরভাবে
নির্দেশ দিয়েছেন যে,- সামাজিক নীতি হিসাবে কেউ যেন জাতিভেদ প্রথাকে প্রশ্রয় না
দেন।
আসলে হরিচাঁদ গুরুচাঁদ ঠাকুরকে নিয়ে এক জাতির
মধ্যে গন্ডী বদ্ধ করে রাখার পিছনের আরও বড় কারণ, হচ্ছে যে,- হরিচাঁদ ঠাকুর তার জ্ঞানের উপলব্ধিতে বুঝতে
পেরেছিলেন যে,
বেদের মধ্যে যে জাতি ভেদের
বীজ রোপন করা হয়েছে, মানুষকে
উচ,
নিচ্ ভেদাভেদ করে এক শ্রেণীর মানুষকে পশুর থেকেও নিচ্ করে রেখেছে, আর অলৌকিক ভগবান, স্বর্গ, নরক, আত্মা, পরমাত্মার পঙ্কিলতায় ডুবিয়ে রেখেছে। সে জন্য
তিনি দৃপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করছিলেন-
কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ
পেলেও খাই।
বেদ বিধি শৌচাচার নাহি
মানি তাই।। - হরিলীলামৃত পৃঃ ১০৪
অর্থাৎ তিনি বেদ ও তার বিধানকে সমাজের জন্য
কুকুরের উচ্ছিষ্ট থেকেও নিকৃষ্ট মনে করে ছিলেন।
তিনি আবার ঘোষণা করেন-
কোথায় ব্রাহ্মণ দেখ, কোথায় বৈষ্ণব।
স্বার্থ বসে অর্থ লোভী যত
ভন্ড সব।।
-লীলামৃত ঠাকুরবাড়ি, ঠাকুর নগর প্রকাশ, পৃঃ ৯৪
তিনি ব্রাহ্মণ এবং বৈষ্ণবদের উদ্দেশ্যে কি
বললেন? এরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য অর্থ
লোভী ও ভন্ড। অর্থাৎ তারা মানুষকে মিথ্যা পাপ, পুণ্য, স্বর্গ, নরক, আত্মা, পরমাত্মা, জন্মান্তর ইত্যাদির ভয় দেখিয়ে আর তার থেকে
মুক্তি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে। এরা সকলেই ভন্ড।
ব্রাহ্মণ এবং বৈষ্ণবদের ধর্মীয় ব্যবসার প্রতি এরকম কুঠারাঘাত করার সাহস আর ক’জন দেখিয়েছেন বলুন তো? আর এর জন্য তারা হরিচাঁদের আদর্শ কি করে
প্রচার করতে পারে?
হরিচাঁদ ঠাকুরের এই কথাকে আরো অগ্নি
স্ফুলিঙ্গ দান করেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। তিনি বলেন-
“ব্রাহ্মণ রচিত যত অভিনব
গ্রন্থ।
‘ব্রাহ্মণ প্রধান’ মার্কা বিজ্ঞাপন যন্ত্র।।” গুরুচাঁদ চরিত- পৃঃ ২৩
ব্রাহ্মণরা যত সব গ্রন্থ রচনা করেছে, সবই তাদের গুণ-কীর্তনের জন্য। সব জায়গায়
ব্রাহ্মণকেই শ্রেষ্ঠ হিসাবে তুলে ধরা
হয়েছে। তাই তাদের রচিত সমস্ত গ্রন্থ হচ্ছে ‘বিজ্ঞাপন যন্ত’।
তো আমরা হরিচাঁদ ঠাকুর ও গুরুচাঁদ ঠাকুরের
অগণিত বাণীকে পাই যে গুলো সমাজ সংস্কার মূলক। মানুষকে প্রগতির দিশা দেখানোর সোপান।
কিন্তু শুধুমাত্র ব্রাহ্মণ্যবাদী জাত
ব্যবস্থার শৃংখল দ্বারা তাদের কর্ম ধারাকে গন্ডীবদ্ধ করে রেখেছে। আর এই কাজে
প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে সমাজের কিছু ডিগ্রীধারী পন্ডিত। যে
পন্ডিতেরা বিভিন্ন সংগঠনের উচ্চ পদে বসে আছে। আর হরি-গুরুচাঁদের বাণী, কর্ম ও আদর্শকে এগিয়ে না নিয়ে, নিজেদের নাম কেনার জন্য দোকানদার সেজে বসে
আছে। আশাকরি,
এই ডিগ্রীধারী দোকানদারদেরকে
সুবুদ্ধি সপন্ন মানুষেরা তাড়াতাড়ি চিনতে পারবেন। কারণ, এই ডিগ্রীধারীরাও ব্রাহ্মণ্যবাদের পৃষ্ঠপোষক।
তাই এই পৃষ্ঠপোষকদের যদি ঘুম না ভাঙ্গে তাহলে
সমাজের সুবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চয় একদিন এদের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যকে বানচাল করে
দিয়ে দিকে দিকে হরি-গুরুচাঁদের সঠিক ধর্ম-দর্শনকে পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে
দেবেন;
এই আশা করে সমাপ্ত করছি।
__________________________

Comments
Post a Comment