Skip to main content

বুদ্ধ, হরিচাঁদ ও আম্বেদকরের আন্দোলন: একটি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক যোগসূত্র লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়

 


বুদ্ধ, হরিচাঁদ ও আম্বেদকরের আন্দোলন: একটি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক যোগসূত্র

লেখক: জগদীশচন্দ্র রায়

    মতুয়া আন্দোলনের ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন প্রায়ই দেখতে পাই যে, মতুয়া আন্দোলনের সঙ্গে বুদ্ধকে এবং আম্ববেদকরকে কেন সংযুক্ত করা হচ্ছে। বিষয়টাকে সাধারণ দৃশটিতে বিশ্লেষণ করলে কিন্তু সঠিক তাৎপর্যকে অনুধাবন করা যাবে না। কারণ, যেকোন ঘটনার পিছনে যেমন কারণ থাকে, আর সেই কারণের সঙ্গে জুড়ে থাকে তার অস্তিত্ত্বের প্রশ্ন আর একটি কথা এই আলোচনার ভিতরে যতো প্রবেশ করবেন, কিছু কিছু পাঠকের মনে হতে পারে আমি ‘মতুয়া ধর্ম’ কে বৌদ্ধ ধম্মে রূপান্তরিত করার চেষ্টা করছি। আমি যে যুক্তি ও তথ্য উপস্থাপন করেছি সেটার উদ্দেশ্য শুধু আপনাদের কাছে তুলে ধরা। গ্রহণ বা বর্জন আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার       

আমরা প্রথমেই দেখে নেই মতুয়া আন্দোলন বা হরি-গুরুচাঁদের সঙ্গে বুদ্ধের কী সম্পর্ক আছে

     আমি প্রথমেই এই ধরনের প্রশ্ন কর্তাদের অনুরোধ করব যে, তাঁরা যেন যুক্তিবাদী মানসিকতা নিয়ে মতুয়া আদর্শকে বিচার বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করেনআর এই বিচার বিশ্লেষণের জন্য তাদের ‘হরিলীলামৃত’কে গভীর ভাবে অধ্যায়ন করা দরকারতা না হলে এই লেখা তাদের কাছে তেমন একটা সন্তোষজনক নাও হতে পারে ‘লীলামৃত’-এর ১৫ পৃষ্ঠায়- ‘শ্রীশ্রীহরিঠাকুরের জন্ম বিবরণ’ (প্রথম সংস্করণ ১৩২৩ বঙ্গাব্দ) -এ লেখা আছে

বুদ্ধের কামনা তাহা পরিপূর্ণ জন্য।

যশোমন্ত গৃহে হরি হৈল অবর্তীণ ।।

 

অর্থাৎ বুদ্ধের কামনাকে পূর্ণ করার জন্য হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্ম হয়এখন প্রশ্ন হচ্ছে বুদ্ধের কী  কামনা ছিল? বুদ্ধের কামনাকে জানতে বা বুঝতে হলে বুদ্ধ-ইজম বা বুদ্ধধম্মের আদর্শকেও (Buddhism) জানতে হবেতা না হলে এর গভীর মর্ম অনুধাবন করা সম্ভব হবেনা  

    অমরা এখানে দেখতে পাই যে, বুদ্ধের কামনা কে পূর্ণ করার জন্য হরিচাঁদ ঠাকুর জন্ম গ্রহণ করেছেন বা অবতীর্ন হয়েছেনআর্থাৎ বুদ্ধ দর্শনের ভাবনায় বা বিচার ধারাকে পূর্ণ করার চেষ্টাটা  অনেক ক্ষেত্রে হরিচাঁদ ঠাকুরের কর্মের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে অর্থাৎ বুদ্ধিজমের পরবর্তী stage  হচ্ছে মতুয়া-ইজম বা মতুয়া দর্শন। মূল হচ্ছে বুদ্ধ দর্শন সেটাকে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে নবরূপায়ণ করা হয়েছে। কেন এই ভাবনা? হ্যা, এই ভাবনার গভীরে প্রবেশের পূর্বে আমরা জেনে নেই  বুদ্ধের কামনা সম্পর্কে-

চরথং ভিখ্‌খবে চারিক্কম্‌

বহুজন হিতায়, বহুজন সুখায় 

অন্তানু হিতায়, লোকানুকম্‌পায়

আদি কল্যাণ, মধ্য কল্যাণ, অন্ত কল্যাণ

    বুদ্ধ পাঁচ জন ভিক্ষুর সামনে এই গাথা বলেনতাদের তিনি বলেন, হে ভিক্ষুগণ, তোমরা চলতে চলতে ভিক্ষা করবেআর্থাৎ পায়ে হেটে ভিক্ষা করবেআর এই চলার সঙ্গে জনে (প্রত্যেকে) জনে বহুজনদের কাছে গিয়ে প্রচার করবে, যে বিচার ধারা প্রারম্ভে কল্যাণকারী, মধ্যে কল্যাণকারী, আর অন্তেও কল্যাণকারী হবেআর সেটা অল্পজনের হিত্‌ সংরক্ষণকারী নয়। সেটা হবে বহুজন হিতায় এবং বহুজন সুখায়

    আমরা মতুয়াইজমে দেখতে পাই –

                            জীবে দয়া, নামে রুচি, মানুষেতে নিষ্ঠা।

                            ইহা ছাড়া আর যতো সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।। 

                                                (শ্রীশ্রী হরিলীলামৃত ১ম প্রকাশ, পৃ. ১১)


    এখানে মানুষ তথা সমস্ত জীবের প্রতি দয়া করা, তাকে ভালোবাসা ও বিশ্বাস ভক্তি শ্রদ্ধার কথা বলা হয়েছে। বাকি সব কিছুকে 'ভ্রষ্টা' বলা হয়েছে।

    আমরা আরও দেখতে পাই বুদ্ধের মূল আদর্শ হচ্ছে- সমতা, স্বতন্ত্রতা, বন্ধুতা ও ন্যায়

আর মতুয়াইজমের মূল আদর্শ – সত্য, প্রেম ও পবিত্রতা।

তো হরিচাঁদ ঠাকুরও সেই আদর্শ বা কামনায় অনুপ্রানিত হয়েছিলেন যেটা কল্যাণকর, যেখানে কোন ভেদাভেদ নেই, নেই হিংসা-দ্বেষআর সেই আদর্শকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পরিবর্তন করে তিনি ‘বৌদ্ধধম্ম-এর নবরূপায়ণ করলেন ‘মতুয়াধর্ম’ নাম দিয়েএখানে আরও একটি কথা থেকে যায়, বুদ্ধের কামনাকে পূর্ণ করার কথাঅর্থাৎ হরিচাঁদ ঠাকুর ভাবনায় এটাও ছিল যে, বুদ্ধের কামনা বা আদর্শ পূর্ণতা পায়নিসম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়নিসেই অপূর্ণতাকে তিনি পূর্ণ করতে চান। তাই তার আবির্ভাব এই আবির্ভাব মানে জন্ম। কিসের জন্ম? আদর্শের জন্ম। কার আদর্শ? বুদ্ধের আদর্শ। আর এই অপূর্ণতাকে তিনি পূর্ণ করার জন্য বুদ্ধের বিচার ধারার প্রচারক ভিক্ষুদের ন্যায় মতুয়া প্রচারক নির্মাণ করেনযাদেরকে পাগল, গোঁসাই নাম দেনতবে তিনি জানালেন, এই মতুয়া ধর্ম প্রচারের জন্য সন্যাসী হতে হবেনাতিনি গৃহ ধর্মকে বেশি প্রাধান্য দিলেনআর বললেন, হাতে কাম আর মুখে নাম করার জন্য। 

 

    এবার আমরা দেখে নেই হরিচাঁদ ঠাকুর বৌদ্ধধম্মের আদর্শের নবরূপায়ণ করে মতুয়াধর্ম দর্শন কেন করলেন।  

   প্রথমেই আমি বলেছি সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে হরিচাঁদ ঠাকুর এটা করে ছিলেন। কিন্তু সেই সময়টা কী ছিল? সেই ইতিহাসের মধ্যে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিজমের বীজযে বীজটার মধ্যে  বৌদ্ধধম্ম দর্শনের সব গুণ নিহিত ছিলকিন্তু কালের বিবর্তনে যেমন অনেক প্রাণীও পরিবর্তীত হয়,  তেমনি এই কালের বিবর্তনে বিচারধারার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়। সেই অনুসারে বুদ্ধিজমকে পরিবর্তিত করে মতুয়াইজম করতে হয়েছিল হরিচাঁদ ঠাকুরকে   

     এবার আসি সেই কালের বিবর্তন বা সেই ইতিহাস সম্পর্কে

     আপনারা এটা নিশ্চয় জানেন যে, হরিচাঁদ ঠাকুরকে পতিত পাবন বলা হয়। পতিত এবং পাবনদুটি শব্দপতিত অর্থাৎ উপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়া। আর পাবন অর্থাৎ উদ্ধার করাপতিত পাবন অর্থাৎ নিচে পড়ে যাওয়াকে টেনে তোলা বা উদ্ধার করাএবার কথা হচ্ছে- কে বা কারা  কিভাবে পড়ে গিয়েছিল? কোথা থেকে পড়ে গিয়েছিল? কে বা কারা এই পড়ে যাওয়া বা  ফেলে দেওয়ার কাজ করেছিল? কেন ফেলে দিয়েছিল?

   ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই বাংলায় প্রায় চারশ বছর পাল রাজত্ব ছিল। আর এই পালরা ছিল বুদ্ধিষ্টতাই ‘গুরুচাঁদ চরিত’-এ আমরা দেখতে পাই-

পালবংশ মহাতেজা   বঙ্গদেশে যবে রাজা

        বৌদ্ধ ধর্ম্ম আসিল এদেশে

 বৌদ্ধ রাজ-ধর্ম্ম মানি বঙ্গবাসী যত প্রাণী

 বৌদ্ধ ধর্ম্মে দীক্ষা নিল শেষে।।

                                                       (পৃষ্ঠা নং ২৮ ,পঞ্চম সংস্করণ ২০০৯ )


এতক্ষণে আমরা জানার চেষ্টা করলাম বুদ্ধের বা বৌদ্ধ ধম্মের সঙ্গে হরিচাঁদ ঠাকুর বা মতুয়া ধর্মের সম্পর্কে।

 


এবার আমরা দেখে নেই বাবা সাহেবের সঙ্গেই বা কি সম্পর্ক আছে হরি
-গুরুচাঁদ ঠাকুর বা মতুয়া ধর্মের সঙ্গে

        বাবা সাহেব ১৯৩৫ সালে ঘোষণা করেন ‘আমি হিন্দু হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিযেটা  আমার হাতে ছিল না। অর্থাৎ আমার কিছু করার ছিলনাতবে আমি হিন্দু হয়ে মৃত্যু বরণ করব না আর তিনি ১৯৫৬ সালের অশোক বিজয় দশমীর দিন বৌদ্ধ ধম্ম স্বীকার করেন  বা স্বধম্মে প্রত্যাবর্তন করেন। স্বধম্মে কেন বলছি? কারণ বাঙলার নমঃদের যেমন ব্রাহ্মণরা ধর্মহীন করের পতিত করে রেখে ছিলতেমনি ভারতবর্ষের বাকিদেরও  অর্থাৎ যারা ব্রাহ্মণ্ধর্ম স্বীকার  করেননি তাদেরও অস্পৃশ্য করে রেখে ছিল। এদের ও কোন ধর্ম ছিল নাকিন্তু পূর্বে এঁরা সকলে বৌদ্ধ ধম্মের ছিলেনতাই সামগ্রিক ভাবে দেখলে আমরা দেখতে পাই পূর্বের বৌদ্ধরা পরবর্তিতে পতিত  ও অস্পৃশ্যে পরিণত হনবাবা সাহেব এই ইতিহাস খুব ভাল করে জানতেন তাই তিনি স্বধম্মে  প্রত্যাবর্তন করেন এবং এই অস্পৃশ্যদের কে পূনঃরায় বৌদ্ধধম্ম স্বীকার করানোর প্রক্রিয়া শুরু করেন   

      এবার আমরা একটু অন্যভাবে ভেবে দেখিহরিচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনকে অগ্রগতি দেওয়ার  কাজ করেন গুরুচাঁদ ঠাকুরতিনি সব চেয়ে বেশি জোর দেন শিক্ষা আন্দোলনের উপরযার ফলে সমাজের অবহেলিত লোকেরা মুক্তির আলো দেখতে পান, অনেক সুফল  উপভোগ করেনতবে সেই আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করেন মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলতিনি তাঁর কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠাতে সক্ষম হনবাবাসাহেব সংবিধানের মাধ্যমে এই অবহেলিত, পতিত, অস্পৃশ্যদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে তাদের উত্তরণের রাস্তাকে সুদূরপ্রসারী করেনসাংবিধানিক নিরাপত্তা দেন Scheduled Caste, Scheduled Tribe এবং Other Backward Class নাম দিয়েযার ফলে এই লোকেরা এই সাংবিধানিক সুবিধা গ্রহণ করে শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছেন 

    এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, হরিচাঁদ ঠাকুরের আন্দোলনকে অগ্রগতি দেন গুরুচাদ ঠাকুর গুরুচাঁদ  ঠাকুরের আন্দোলনকে আরো প্রসারিত করেন রাজনৈতিকভাবে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। এই  আন্দোলনকে সাংবিধানিকভাবে রক্ষা করার জন্য মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বাবা সাহেবকে সংবিধান সভায় পাঠানআজও আমরা যারা শিক্ষায় ও চাকরিতে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি, সেটা এই সাংবিধানিক কারণেতো  আমরা বিচারধারা এবং বিচারধারার প্রগতির আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখ্‌তে পাচ্ছি যে, একটা সুদৃঢ় যোগসুত্র রয়েছেকারো অবদান অন্যের থেকে কম বা বেশি নয় একটার সঙ্গে একটা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িতএকটার অনুপস্থিতে অন্যটাও লুপ্তপ্রায়তাই আমরা আন্দোলনের দৃষ্টিতে  দেখতে পাচ্ছি যে, হরি-গুরুচাঁদ ঠাকুররের সঙ্গে যেমন বুদ্ধের আন্দোলন ও ধম্ম মিলেমিশে আছে, তেমনি এর সঙ্গে জুড়ে আছে মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের নেতৃত্বে বাবাসাহেবকে সংবিধান সভায় প্রেরণের সংগ্রামআর এই সংবিধানের রক্ষাকবচ হচ্ছে সমস্ত আন্দোলনের ফসলযে ফসকে আমরা উপভোগই করে চলেছি- কাঁরা  কিভাবে আমাদের এই সুবিধা এনে দিলেন সেটা  আজ আমরা জানতেও আগ্রহী নইউল্টা সেই সব মহামানবদের অবদানকে একদিকে উপভোগ করছি আর অন্যদিকে তাঁদেরকে অস্বীকার করছিএটা একটা জাতির ক্ষেত্রে এটা মারাত্ত্বক ক্ষতিকর। অচিরেই এর প্রভাব পড়তে বাধ্যতাই  আশাকরি, আপনারা আপনাদের উদ্ধারের জন্য  যে মহামানবরা আমরণ সংগ্রাম করেছেন, আপনারা তাঁদের যোগ্য সম্মান দেবেন এবং তাদের প্রদর্শিত আদর্শকে অনুসরণ করে, pay back to the society করে ঋণমুক্ত হওয়ার কাজে ব্রতী হবেন।  

----------------------------------------------------------------------------------


Comments