Skip to main content

হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন ও দর্শন -জগদীশচন্দ্র রায় (মুম্বাই)







মহামানব হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন ও দর্শন

লেখক- জগদীশচন্দ্র রায়

     উনবিংশ তথা বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস হচ্ছে আধুনিক ভারত নির্মাণের ইতিহাস। এই দুই শতাব্দীতে ভারতবর্ষে যে যে সমাজ ক্রান্তিকারী, সমাজ চিন্তক এবং সমাজ সংস্কারক জন্ম গ্রহণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে পতিত পাবন হরিচাঁদ ঠাকুর এবং তৎপুত্র শিক্ষার অগ্রদূত গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। হাজার বছর ধরে মুঠিভরা (হাতের মুঠি) জনসংখ্যার ব্রাহ্মণ্যবাদীরা সকল ভারতবাসীর উপর ধর্ম এবং সংস্কৃতির নামে যে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা স্থাপন করেছিল; তার বিরুদ্ধে গত দুই শতাব্দী ধরে বিদ্রোহ করার মহান নেতাদের মধ্যে বাংলার প্রথম বিদ্রোহী ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর।

    বাস্তবে ২৫০০ বছর পূর্বে ব্রাহ্মণ্যধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা উঠিয়েছিলেন তথাতগ গৌতম বুদ্ধ। তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদকে স্বমূলে নষ্ট করে নতুন মানবতাবাদী সংস্কৃতি তথা আচরণমূলক ধম্মের স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বুদ্ধের ক্রান্তির সুফল কমতে থাকে আর 185 খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সেনাপতি পুশ্যমিত্র শুঙ্গ মৌর্যবংশের শেষ সম্রাট নাবালক বৃহদ্রথকে প্রকাশ্য রাজসভায় হত্যা করে সম্পূর্ণরূপে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের স্থাপন করে।

     উনিশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এতটা বিকৃত রূপ ধারণ করেছিল যে, তার কল্পনা করলেও ভয়ে মন কেঁপে ওঠে। বুদ্ধ (563 B.C.) এবং হরিচাঁদের (11th March 1812) জন্মের সময়ের মাঝে ভারতে অনেক সাধু-মহামানব জন্ম গ্রহ করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এটা হচ্ছে যে, এই সাধু-মহামানবেরা কখনও কখনও ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের বিরুদ্ধে আলোচনা করেছেন; কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা হাতে নিয়ে সংঘর্ষ করার সাহস সামান্য কয়েক জনই দেখিয়েছেন। বাবাসাহেব আম্বেদকরের কথায় বলতে হয়,-“এই মহাত্মারা অনেক ধূলা উড়িয়েছেন, কিন্তু লোকের সামাজিক স্তরকে কখনও উঁচু করেননি।  তথাগত বুদ্ধের পরে প্রায় 25০০ বছর পরে মহারাষ্ট্রে যেমন মহাত্মা জ্যোতিরাও ফুলে (11th April 1827) এই সাহস দেখিয়েছেন, তেমনি একই সময়ে বাংলায় ধর্মহীন পতিত লোকদের ব্রাহ্মণ্যবাদী উৎপীড়ন থেকে উদ্ধার করার জন্য ঠাকুর হরিচাঁদ আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

 বেদকে অস্বীকার

হরিচাঁদ ঠাকুর প্রথমেই বেদ এবং তার নিয়মকে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন-

কুকুরের উচ্ছিষ্ট প্রসাদ পেলেও খাই।

বেদবিধি শৌচাচার নাহি মানি তাই।।

                                                       (লীলামৃত, ১ম সংস্করণ, পৃষ্ঠা নং-১০৪)

অর্থাৎ আমি কুকুরের উচ্ছিষ্ট বা এটো খাবার খেতেও রাজি আছি; কিন্তু বেদ এবং তার বিধানকে (নিয়ম-নীতি) মানতে রাজি নই তিনি বেদকে কুকুরের এটো খাবারের থেকেও নিকৃষ্ট মনে করেছেন। সে জন্যই তিনি আধুনিক ভারতের সামাজিক ক্রান্তিকারীদের মধ্যে অন্যতম স্থান গ্রহণ করেছেন।

পতিত পাবন ঠাকুর হরিঁচাদের জন্মের পূর্বে বাংলার পরিস্থিতঃ-

   সেই সময় বাংলায় সাধারণ মানুষের  সামগ্রিক পরিস্থিতি ভীষণ ভয়াবহ ছিল। তার মধ্যে-

No.-1 সাউথ ইন্ডিয়ান ব্রাহ্মণ বল্লাল সেন, বাংলার ক্ষমতা দখল করার পর, পাল রাজাদের সময়ের বুদ্ধিষ্ট নমঃজাতির লোকেরা তার প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে মানতে অস্বীকার করলে এই নমঃজাতির লোকদেরচন্ডাল বলে ঘোষণা করে দেয়।

No.-2 বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে সমাজে ব্যাভিচার বেড়ে গিয়েছিল। আর ব্রাহ্মণ্যবাদীরারিব লোকদের ধার্মিক শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছিল। মানুষের সঙ্গে পশুর থেকেও খারাপ ব্যবহার করত।

No.-3 জমিদার লোকেরা গরিব কিষাণ মজুরদের উপর অমানবিক অন্যায় অত্যাচার করত। এদের কাছে তখন মানবিকতা নামক শব্দ বলে কিছু ছিলনা।

জন্মঃ-

উপরে বর্ণিত এরকমই এক অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার ও অমানবিক সংকুল পরিস্থির মধ্যে 1812 সালের 11ই মার্চ, বাংলার ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমার অজ্‌ পাড়াগাঁয়ে সফলাডাঙ্গা  নামক গ্রামে ঠাকুর হরিচাঁদ জন্মগ্রহ করেন।

    তাঁর পিতার নাম যশোমন্ত (Jashomanta) ঠাকুর আর মাতার নাম অন্নপূর্ণা আর তাঁর ঠাকুরদার নাম ছিল মোচাই ঠাকুর

শ্রীমোচাই হোতে পেল ঠাকুর উপাধি।

গোড়াতে রহিল কিন্তু বিশ্বাস পদবী।।

                                                      (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং-249)

অর্থাৎ হরিচাঁদ ঠাকুরের ঠাকুরদা শ্রীমোচাই এর সময় থেকে ঠাকুরপদবী শুরু হয়। আর এর পূর্বে বিশ্বাস পদবী ছিল  

হরিচাঁদ ঠাকুরেরা ৫ ভাই ছিলেন-(১)কৃষ্ণদাস (২) হরিচাঁদ (৩) বৈষ্ণবদা (৪) গৌরিদাস ও (৫) স্বরূপদাস। 

বিদ্রোহী বালক হরিচাঁদ

    হরিচাঁদের পিতা যশোমন্ত পরম বৈষ্ণব ভক্ত ছিলেন। সংসারে অনেক অভাব অনটন থাকা  সত্বেও কোন বৈষ্ণবের সেবা না করে নিজে আহার গ্রহণ করতেন না। হরিচাঁদ ছাড়া বাকি ভাইয়েরাও পিতার মত বৈষ্ণব ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন।

হরিদাস ছাড়া বাকি পুত্র ছিল যতো।

  বৈষ্ণব দেখিলে সবে হইত পদে নতো।।

                                                      (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং- 258)

তাই বৈষ্ণব দেখ্‌লেই বাকি ভাইয়েরা ভক্তিতে গদগদ হয়ে তাঁদের পায়ে পড়তেন। কিন্তু সমস্যা  দেখা দেয় হরিচাঁদকে নিয়ে।

পিতার আদেশে সেবা করে ভাই চারি।

হরিচাঁদে নিয়ে বটে গোলযোগ ভারী।।

 পদরজঃ দূরে থাক্‌ দণ্ডবৎ নাই।

                               প্রহার পীড়ন কর যথাপূর্ব তাই।।

যশোবন্ত বলে, ‘হরি! রজঃ মাখ অঙ্গে।

অলক্ষিতে চলে হরি চাহিয়া অপাঙ্গে।।

ইঁদুরের তোলা মাটি অঙ্গে মাখি তাই।

বলে মাখিয়াছি রজঃ তুমি দেখ নাই।।

                                   (লীলামৃত, ঠাকুরনগর, 2009, p. 54)

    পিতা যশোমন্ত বৈষ্ণবদের সামনে প্রায়ই সমস্যায় পড়ে যেতেন বালক হরিচাঁদকে নিয়ে। অন্য চার পুত্র পিতার আজ্ঞামত বৈষ্ণবদের দেখলে পায়ের ধূলা নিতেন। কিন্তু হরিচাঁদ? বৈষ্ণবদের  পায়ের ধূলা গ্রহণ তো দূরের কথা, মাথাও নিচু করতেন না। (পদরজঃ দূরে থাক্‌ দণ্ডবৎ নাই।) এর জন্য তাঁকে যতই বকাবকি করা হোকনা কেন তাতে তাঁর মধ্যে কোন পরিবর্তনের লেষমাত্র দেখা যেতনা। এমনকি তাঁর পিতা যখন বলতেন, হরি! রজঃ মাখ অঙ্গে। অর্থাৎ পায়ের ধূলা অঙ্গে মাখ। তখন সবার অলক্ষ্যে ইঁদুরের তোলা মাটি অঙ্গে মেখে এসে বলতেন, এই দেখ আমিতো মাখিয়াছি রজঃ। এরকম দুরন্ত বালককে নিয়ে পিতা যশোমন্ত প্রায়ই কিছু না কিছু সমস্যায় পড়েতেন।   

    আসলে বাল্যকাল থেকেই হরিচাঁদের স্বভাবে বিদ্রোহীভাব ফুঁটে উঠেছিল। তিনি বৈষ্ণবদের কর্ম-কান্ড একদম পছন্দ করতেন না। তাই

ঝোলা রাখি বৈষ্ণবেরা স্নানে, পানে যায়।

                               উজাড় করিয়া ঝোলা ঠাকুর ফেলায়।।       (ঐ)

বৈষ্ণবেরা ঝোলা রেখে যখন স্নান করতে যেতেন, তখন হরিচাঁদ তাঁদের ঝোলা উল্টিয়ে ফেলে দিতেন। তিনি যে বৈরাগীদের পছন্দ করতেন না তারই বহিঃপ্রকাশ এইভাবে করতেন। কিন্তু তাঁর পিতা এসব দেখে রেগে যেতেন-

দুরন্ত অশান্ত পুত্রে পিতা দেয় দন্ড।

 কেঁদে বলে হরিচাঁদ বৈরাগীরা ভন্ড।।    (ঐ)

এই দুরন্ত অশান্ত পুত্রকে তিনি শাস্তি দিতেন। তখন হরিচাঁদ পিতার দেওয়া শাস্তি ভোগ করেও চুপ না থেকে বলতেন যে, ঐ বৈরাগীরা হচ্ছে ভন্ড। ছোট্ট বালকের মুখে এরকম কথা শুনে পিতা অবাক হয়ে যেতেন। তিনি ভাবনায় পড়ে যেতেন, এইটুকু বালক বৈষ্ণবদের দেখলে এরকম  ব্যবহার কেন করে! তিনি তখন এর সদুত্তোর খুঁজে না পেয়ে হরিকে আবার আদর করতেন।

তখন-                       পিতৃ-কোলে থাকি হরি ক্রোধ করি বলে।      

                           ভন্ডবেটা বৈরাগীরা দূরে যা রে চলে।। (ঐ)

পিতার কোলে থেকে আদর ও শান্তনা পেয়ে হরি আরো রেগে গিয়ে বলেতেন-এই বৈরাগীরা হচ্ছে ভন্ড, এঁদের তুমি অন্য কোথাও চলে যেতে বল।

এইভাবে বৈষ্ণবদের প্রতি বালক হরিচাঁদের ক্রোধ যেমন বৃদ্ধি পেতে থাকে, তেমনি তাঁর দুরন্তপনাও দিনকে দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর দুরন্তপনার আর একটি নিদর্শনে দেখতে পাই-

একদা এক বৈরাগী জপমালা করে।

                                চক্ষু মুদে বসে একা বারান্দা উপরে।।

হরিদাস এসে পিছে করিয়া ভ্রুকুটি।

                               বৈরাগীর টিকি দেয় একপোচে কাটি।।

                                                   (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং- 258)

একদিন একজন বৈরাগী মালা জপ করছিলেন। তখন বালক হরিদাস ঐ বৈরাগীর পিছনে গিয়ে তাঁর টিকি কেটে দেন। তখন বৈরাগী রাগ আর অপমানে জ্বলে উঠে গালাগাল ও অভিশাপ দিতে থাকেন। বৈরাগীর অভিশাপ শুনে হরিদাস বলেন-

সত্যবাদী ভিন্ন শাপ কভু তো ফলে না।

                               সত্যাশ্রয়ী হলে কেহ শাপ তো দেবে না।।

                                                         (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং- 259)

অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি সত্যকে আশ্রয় করে চলেন, তিনি যদি কোন অভিশাপদেন তাহলে সেটা সত্যি হলেও হতে পারে; কিন্তু ভন্ড লোকের অভিশাপের তো কোন মূল্য নেই। আর যিনি সত্যবাদী হন, তিনি তো কাউকে অভিশাপ দেওয়ার মত অযৌক্তিক কাজ করতে পারেন না।

   এই ঘটনা দেখে হরিচাঁদের পিতা তাঁকে ধরার জন্য চেষ্টা করেন। তখন-

লম্ফ দিয়ে হরিদাস চলে গেল দূরে।

 বলে বাবা দাস কভু বলিও না মোরে।।

পৃথিবীতে দাস বাবা আমি কারো নই।

সত্যের নির্দেশে চলি এর দাস হই।।

------------------------------

                               হরিদাস নামে মোর মনেতে বিষাদ।

দাস স্থানে চাঁদ জুড়ে ডেকো  হরিচাঁদ।।

                                            (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং- 260)

হরিচাঁদকে তাঁর পিতা ধরার চেষ্টা করলে লাফ দিয়ে দূরে সরে যান। আর তাঁর বাবাকে বলেন যে, “আমাকে দাসবলে ডাকবে না। এই পৃথিবীতে আমি কারো দাস নই। আমি শুধু যেটা সত্য, সেই সত্যের নির্দেশকে মেনে চলি। তাই আমি শুধুমাত্র সত্যের নির্দেশ ব্যতীত অন্য কারো দাস নই।  তাই আমাকে হরিদাস বলে ডাকলে আমার খুব দুঃখ হয়। দাস স্থানে চাঁদ জুড়ে আমাকে  হরিচাঁদ বলে ডেকো।

     এই ঘটনা হরিচাঁদের বড় ভাই কৃষ্ণদাস দেখছিলেন। তিনি বালক হরিচাঁদের মুখ থেকে এই কথা শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে আনন্দে হরিচাঁদকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করেন।

কৃষ্ণদাস ছুটে এসে ভাই নিয়ে বুকে।

বলে হরিচাঁদ নামে ডাকিব তোমাকে।।     (ঐ)                                           

এসব দেখে মাতা অন্নপূর্ণাও আর স্থির থাকতে না পেরে তিনিও খুশিতে হরিচাঁদকে কোলে তুলে আদর করেন।          

অন্নপূর্ণা উঠে বলে পুত্র নিয়ে কোলে।   

                               তুই মম চাঁদ বাবা জানিবে সকলে।।     (ঐ)

বলেন, তুই তো আমার চাঁদ আজ থেকে সবাই তোকে হরিচাঁদ বলে ডাকবে।

অবশেষে পিতা যশোমন্ত আর চুপ থাকতে না পেরে হরিচাঁদকে কোলে নিয়ে অনেক আদর করতে থাকেন। আর এইভাবে দুরন্তপনা ও স্নেহ ভালবাসার মধ্য দিয়ে হরিচাঁদ তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে থাকেন

  লোকায়ত ইতিহাস থেকে  সত্যের অনুসন্ধান

    শৈবকাল থেকেই হরিচাঁদের চিন্তা-ভাবনা, ক্রিয়া-কর্ম, চলন-বলন সব কিছুই অন্যের থেকে  পৃথক মনে হত। প্রায়ই মনে হত তিনি যেন কোন গভীর ভাবনার মধ্যে ডুবে আছেন। বয়ষ্ক   লোকদের কাছে গিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন কিন্তু তিনি যেটা খুঁজছিলেন, তার অনুসন্ধান বেশীরভাগ লোকই দিতে পারতেন না। যদিও অতীতের অনেক ইতিহাস গল্পাকারে লুকিয়ে আছে মানুষের মধ্যে। তবুও তিনি খুঁজে ফেরেন তার আকাঙ্খিতথ্যের সন্ধানে    

       কলি যুগের পূর্ববর্তী তিন যুগে অনেক অবতার জন্মগ্রহ করেছেন। আর সেই অবতাররা  ব্রাহ্মণদেরই উপকারে এসেছে। কিন্তু কলিকালে কোন অবতার জন্মগ্রহ করেনি। জন্মগ্রহ করেছেন মহামানবেরা। যাঁরা হচ্ছেন সনাতন কালের ২৭ জন পূর্ববুদ্ধ। আর তারপর গৌতম বুদ্ধ। এঁরা মানবতার জয়গান করেছেন, কোন ব্যক্তি বা বর্গ বিশেষের নয়। এই সময় ব্রাহ্মণ্যবাদ প্রায় অবলুপ্ত হয়ে যায়। বাংলায় তো ১১৩০ সালের পূর্বে কোন ব্রাহ্মণ প্রবেশই করতে পারেননি। কারণ বাংলায় পাল রাজারা প্রায় চারশ বছর রাজত্ব করেছেন। আর এই পাল নৃপতিরা ছিলেন বৌদ্ধ ধম্মাবলম্বী।                       

     হরিচাঁদ বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন- 

গৌতম বুদ্ধের কথা শুনিতে শুনিতে।

পূর্ব বুদ্ধদের তথ্য ধরিল জ্ঞানেতে।।

                                               (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং-২৮১)

তিনি বয়ষ্ক লোকদের কাছ থেকে গৌতম বুদ্ধের কর্ম-কান্ড শুনতে শুনতে পূর্ব বুদ্ধদের তথ্যকেও তার জ্ঞান দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করেন। তিনি এটাও জানতে পারেন-

মহান আশোক যিনি শ্রেষ্ঠ নৃপমণি।

                               আনুগত্য ছিল বৌদ্ধে সর্বশ্রেষ্ঠ জানি।।

                               জাতিতে চন্ডাল জেনে এ হেন আশোক।

শিশু হরিচাঁদ মনে জাগিত পুলক।। (তথ্য ঐ) 

মহান সম্রাট অশোক যিনি শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন। তিনি বৌদ্ধের অনুরাগী ছিলেন। তিনি যুদ্ধের হিংসাকে প্রত্যাহার করে মানব কুলে বুদ্ধের প্রেমের বাণী প্রচারের কাজে ব্রতী হন। আর এই মহান রাজা সম্রাট অশোক ছিলেন একজন চন্ডাল বংশজাত। সেই জন্য তাঁকে ‘চণ্ডাশোক’ ও বলা হতো। হরিচাঁদও ছিলেন চন্ডাল বংশের। তাই এ  কথা জেনে বালক হরিচাঁদের মনে গর্ব সঞ্চার হতো। নিজের জাতি যে, হীন্‌ জাতি নয়, শৌর্য-বীর্যশালী গর্বের জাতি এটা বুঝতে পেরে তাঁর জাতির প্রতিও শ্রদ্ধা বেড়ে যেত।

     কিন্তু যখন শুনলেন,- সম্রাট অশোকের বংশধর, নাবালক রাজা বৃহদ্রথকে কূটকৌশলী সেনাপতি পুশ্যমিত্র শুঙ্গ প্রকাশ্য রাজ সভায় তাঁকে হত্যা করে শাসন ভার দখল করে নেয়। আর বৌদ্ধ রাজত্বের পতন ঘটিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসন প্রচলন করে। তখন বালক হরিচাঁদের হৃদয় বেদনায় ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। আর-

                                    ব্রাহ্মণের দুর্নীতি শুরু হল জানা।

                                   ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি জেগে ওঠে ঘৃণা।।  ( তথ্য ঐ) 

 ব্রাহ্মণদের এই দুর্নীতির ইতিহাস জানতে পেরে বালক হরিচাঁদের মনে তাদের প্রতি ঘৃণার উদ্রেক শুরু হয়।

   হরিচাঁদ পাল রাজাদের সম্পর্কেও অনেক কথা জানতে পারেন। পাল রাজাদের বীরত্বের কাহিনি শুনে তাঁর মন গর্বে ভরে যায়। আরও গর্ব বোধ করেন যখন তিনি জানতে পারেন-

ইহারাও নমঃ ছিল জানিল তা ধীরে।

                             বৌদ্ধ ধম্ম ছত্র ছিল ইহাদের শিরে।  ( তথ্য ঐ) 

এই পাল রাজারাও নমঃজাতির ছিল। এবং এঁরা সর্বদা বৌদ্ধের নীতি নিয়েই শাসন কার্য পরিচালনা করতেন। যার ফলে তাদের শাসন কালে জনগনের মধ্যে অনেক সুখ-শান্তি বিরাজ  করত। এই সময় শিক্ষা বিস্তার ও জ্ঞান চর্চার জন্য অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়। এর থেকে হরিচাঁদ ঠাকুর বুঝলেন-

শিক্ষাই জাতির ভিত প্রভু বুঝে নিল।

                              শিক্ষা প্রতি অনুরাগ প্রগাঢ় হইল।।     ( তথ্য ঐ) 

শিক্ষাই হচ্ছে কোন জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা বিনা কোন জাতির অগ্রগতি অসম্ভব। হরিচাঁদ বুঝলেন কোন জাতির উন্নতির জন্য তার ভিত হচ্ছে শিক্ষা। যদিও হরিচাঁদের সময়ে সেই শিক্ষার আলোর প্রতি ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিবন্ধকতা লাগিয়ে রেখে ছিল। হরিচাঁদ নিজেও সেই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার শিকার হয়ে শুধুমাত্র পাঠশালা পর্যন্ত পড়ার পর আর অগ্রসর হতে পারেননি। কিন্তু  তিনি এটা ভাল করে উপলব্ধি করলেন যে, তাঁর জাতিকে জাগাতে হলে শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। তাই পরবর্তীতে সেই গুরুদায়িত্ব তিনি নিজ পুত্র গুরুচাঁদের উপর অর্পণ করেছিলেন।

এর পর হরিচাঁদ সেন রাজাদের অত্যাচারের কথাও জানলেন-

সেন রাজাদের কথা যখনে জানিল।

                        বেদবিধি প্রতি ঘৃণা তীব্রতর হল।।       (তথ্য ঐ)

তখন তাঁর হৃদয়ে বেদবিধির প্রতি তীব্র ঘৃণার উদ্রেক হয়। যার জন্য তিনি তাঁর ধর্ম মত প্রতিষ্ঠাকালে প্রথমেই ঘোষণা করেছিলেন-

কুকুরের উচ্ছিষ্ঠ প্রসাদ পেলেও খাই।

বেদবিধি শৌচাচার নাহিমানি তাই।। 

                                          (হরিলামৃত ১ম সংস্করণ পৃষ্ঠা নং ১০৪)

অর্থাৎ আমি কুকুরের উচ্ছিষ্ঠ বা এটো খাবার খেতেও রাজি আছি। কিন্তু কুকুরের উচ্ছিষ্ঠ থেকে নিকৃষ্ঠ বেদ ও তার বিধানকে মানতে রাজী নই। কারণ পৃথিবীতে এর থেকে অমানবিক ঘৃণ্য কোন গ্রন্থ ও তার নিয়ম হতে পারেনা।

    হরিচাঁদের এই জানার আগ্রহ দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর যে তথ্য জানতে পারেন, সেটাকে তাঁর অন্তরআত্মা দিয়ে সেই পরিস্থিতির ছবিটাকে অনুধাবন করতে চেষ্টা করেন।

    একদিন একজন শতবর্ষ অতিক্রান্ত বৃদ্ধার অনুসন্ধান পেলেন। তিনি সেই বৃদ্ধার কাছে গেলেন বৃদ্ধা আগেই হরিচাঁদের সম্পর্কে কিছু কথা শুনেছিলেন। তাই তিনি বলেন, শুনেছি, তুমি বালক হলেও আমাদের মত মানুষের কাছে গল্প শুনতে ভালবাস? কিন্তু আমার কথা তো কেউ শুনতে চায়  না। তুমি কি আমার মনের ব্যথাকে শুনবে?” হরিচাঁদ বৃদ্ধার কথা শুনতে আগ্রহী হলেন।

কথা প্রসঙ্গে বৃদ্ধা বলে মৃদু হেসে।

                     কিছু পূর্বে পূজা-আশ্রা ছিলনা এ দেশে।

ঠাকুমার মুখে গল্প শুনেছি আমরা।

                            গঙ্গার ওপার হতে এল বামুনেরা।।

                               ফেরিঅলা সম তারা ঘুরে গ্রামে গ্রামে।

                               শুনাত মাহাত্ম্য কথা দেবতার নামে।।

 (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং-২৮২ )

কথায় কথায় বৃদ্ধা বললেন-আমি আমার ঠাকুরমার কাছে গল্প শুনেছি এক সময় এখনকার মত  এদেশে  কোন পূজা-পার্বণ হতো না। সেই সময়ের লোকেরা খুব সুখ-শান্তিতে বসবাস করত।  কারো মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব বিবাদ ছিলনা। প্রায় সবাই কৃষিকাজ করত। কিন্তু গঙ্গার ওপার থেকে নাকি কোন বামুনেরা এসে ফেরিওলাদের মত গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে বেড়াত; আর কি সব দেব দেবতার কথা প্রচার করত। তাতে নাকি সংসারের মঙ্গল হবে। আর ধন সম্পত্তির বৃদ্ধি হবে। ইহকালে সুখী হবে। পরকালের জন্য মোক্ষ লাভ হবে। 

 তা বাবা তুমিই বল, আজ আমাদের লোকদের এই যে যে, দুর্দশা সেটা এই দেব-দেবতার পূজা-পাবন করতে গিয়েই হচ্ছে না? যদি দেব-দেবতার পূজা- পাবন করেই সব কিছু ভালো হবে তাহলে আমাদের এই দুর্দশার মূলে কে? আসলে জানতো বাবা, এই সব হচ্ছে ভেল্কি দেখানো। এই ভেল্কি দেখিয়ে বামুনরা আমাদের লোকদের সর্বস্ব লুটে-পুটে নিচ্ছে। তুমি বাবা ভেবে দেখ এর থেকে কিভাবে নিস্তার পাওয়া যায়। মানুষ আগের মত সেই বৌদ্ধ যুগের শান্তি ফিরে পায়।

বৃদ্ধা তার অন্তরে এই সব আগুনটাকে বের করতে পেরে যেন পরম শান্তি লাভ করলেন।

  আর হরিচাঁদ-                        মুখাশ্রিত তথ্য বহু করিয়া উদ্ধার।

                                             বুদ্ধিমত্তা যোগে ঘষে দেখে বারবার।।

                                            সত্যের সন্ধানে ফেরে সদা হরিচাঁদ।

                                           অতৃপ্ত বাসনা বুকে মনেতে বিষাদ।     (তথ্য ঐ)

লোক মুখের কাহিনি, জনশ্রুত কথা শুনে শুনে হরিচাঁদ তাঁর বুদ্ধি দিয়ে সেই কথা বা কাহিনির বিচার বিশ্লেষণ করেন। আর মনে অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে সত্যের অনুসন্ধানে ফিরে চলেছেন।

 আত্ম অনুভুতি ও আত্ম দর্শন

           শৈশব কৈশোর অতিক্রান্ত করে হরিচাঁদ যৌবনে পদার্পণ করেছেন। তাই শৈশবে তাঁর মধ্যে যে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ পাওয়া গিয়েছিল, সেই চেতনার গভীরতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

       সংসার জীবন আজ তিনি অতিক্রম করতে চলেছেন। কারণ তাঁর দুই পুত্র ও তিন কন্যা  হয়েছে। যার মধ্যে গুরুচাঁদ সব চেয়ে বড়। অন্যান্য ভাইদের অনুরোধে আমভিটার বসবাস স্থল ছেড়ে দিয়ে ওড়াকান্দীর পোদ্দার বাড়িতে এসে বসবাস শুরু করেছেন। কিন্তু এখন তাঁর অন্তরের মধ্যে প্রায়ই কি যেন ভাবনা ঘুরপাক খায় নিরন্তর। যার জন্য তিনি উদাস হয়ে থাকেন। এই উদাস ভাবনা বা একাকিত্বে কিছু চিন্তা বা মন্থন করা শুরু হয়েছিল ছোট বেলা থেকে।

    একবার তিনি শৈশবে তাঁদের বাড়ির পাশের বড় নিমগাছের নিচে চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসে ছিলেন।  

শৈশবেতে সকলের চক্ষু দিয়ে ফাঁকি।

বৃক্ষ তলে হরিচাঁদ বসিত একাকী।।

ভ্রাতাসহ সাঙ্গপাঙ্গ করে যবে খেলা।

হরিচাঁদ বসে থাকে নীরবে একেলা।।

ধ্যানাসনে বসে থাকে মুদি অক্ষিদ্বয়।

হৃদয়েতে হয় কত ভাবের উদয়।।

                                              (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৬৯)

তিনি হয়তঃ তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করে মানুষের সামাজিক ও আর্থিক সমস্যার কিভাবে সমাধান করা যায় সেই কথা মন্থন করছিলেন। কারণ পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তাঁর চিন্তা ভাবনা অন্য ভাইদের থেকে পৃথক ছিল। অন্য ভাইয়েরা বৈষ্ণবদের পদতলে লুটাতে পারলেই নিজেকে ধন্য মনে করত। বৈষ্ণবদের অলীক গল্প ও ক্রিয়া-কর্মই তাদের বেশি পছন্দ ছিল। কিন্তু হরিচাঁদের ভাবনায় ছিল মানুষের সার্বিক মঙ্গল কিভাবে হবে।

তাই এইভাবে হরিচাঁদ যখন ধ্যানে বসে আছেন তখন তাঁর সাথীরা তাঁকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে শুরে করে। কারণ এদিকে তো সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। খবর পেয়ে হরিচাঁদের মাও খুঁজতে বের হন। তিনি দেখেন তাঁর বালক পুত্র নিমগাছের নিচে  ধ্যানস্ত হয়ে বসে আছে। তাঁর কেমন যেন কোন বাহ্য জ্ঞান নেই। কারণ শান্তিমাতা দেখলেন

হঠাৎ দেখিল মাতা বাম জানু পাশে।

                             কাল সর্প ফনা তুলে ফুলিতেছে রোষে।।

                                                                    (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৬৯)

-একটা কাল কেউকেটে শাপ হরিচাঁদের বাম পায়ের উরুর উপরে ফনা তুলে আছে। এই দৃশ্য  দেখে  শান্তিমাতা কিংকর্তব্য বিমুঢ়  হয়ে যান। আর শাপটি অন্য মানুষের উপস্থিতি বুঝতে পারে ধীরে ধীরে বনের মধ্যে চলে যায়।

কি এল কি গেল কিবা ছিল জানু পরে।

কোন কিছু হরিচাঁদ জানিতে না পারে।।

ছুটে গিয়ে মাতা বুকে লয়ে পুত্রধনে।

                                                        (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৬৯)

অর্থাৎ সাপ হরিচাঁদের শরীরের উপর ফনা তুলে ছিল পরে চলে গেল, এসব কিছু তিনি বুঝতে পারেননি। সাপ চলে গেলে শান্তিমাতা ছুটে গিয়ে হরিচাঁদকে কোলে তুলে নেন।

   এইভাবেই হরিচাঁদ শৈশবকাল থেকেই সত্যকে খুঁজে চলেছেন। আর আজ যখন তিনি পরিত বয়সে পদার্পণ করেছেন বা তাঁর বয়স বৃদ্ধি হয়েছে, এখন তাঁর ভাবনাগুলোও সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হচ্ছে। তাই তিনি আজ আবার পরিত বয়সে ধ্যানে বসলেন-

সন্ধ্যার অগ্রেতে প্রভু কি জানি কি ভাবি।

                              বসিলেন বৃক্ষমূলে চিন্তা মাঝে ডুবি।।

অনন্ত আপন মাঝে প্রভু ডুবে রয়।

আপন স্বরূপ প্রভু দেখিবারে পায়।।

                                                       (লীলামৃত, ঠাকুরনগর প্রকাশ ২০০৯)

সন্ধ্যার সময় হরিচাঁদ বকুল গাছের নিচে বসে চিন্তায় মগ্ন হলেন। তিনি যেন দেখলেন তাঁর সামনেই তাঁর বিবেক উপস্থিত হয়ে তাঁর অন্তর-আত্মাকে জাগিয়ে তুলে তাঁর অন্তরের মধ্যে প্রবাহিত হওয়া তুফানকে শীতল করার রাস্তা বলে দিচ্ছেন।

কি সেই তুফান-

যত যত বিধি দেখে চোখের গোচরে।

ততোধিক তত্ত্ব দেখে অন্তর গভীরে।।

বিজ্ঞানের দৃষ্টি আর যুক্তিবাদী মন।

আড়ালে সত্য খুঁজে ফেরে সর্বক্ষ।।

চাপা পড়ে আছে যত পূর্ব ইতিহাস।

হরিচাঁদ কাছে ক্রমে হইল প্রকাশ।।

                                            (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৬৯)

    তিনি তাঁর ধ্যানের মাধ্যমে অন্তরআত্মা দিয়ে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে তার সমাধান খুঁজছেন। সমাজে যত ধর্মীয় নিয়ম কানুন আছে যেটা মানুষের জন্য বাস্তবে ঘৃণ্য, এর কারণ তিনি খুঁজে বের করেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও যুক্তিবাদী মন দিয়ে অনুসন্ধান করে। মূলনিবাসীদের শৌর্য বির্যের যে অতীত ইতিহাস চাপা পড়ে আছে ধীরে ধীরে সেই সব তত্ত্বেরও প্রকাশ ঘটে তাঁর কাছে।

তিনি আরো খুঁজে পান-

অন্ধত্বের মূলে দেখে বৈদিকতা ভাব,

বুঝিল এভাব শুধু বৈদিক স্বভাব।।

বৈদিক পোষাক যদি নাহি ফেলে খুলে।

পতিতেরা জাগিবেনা কভু কোন কালে।।

                                                         (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৬৯)

মানুষের মধ্যে যে অজ্ঞানতার অন্ধকার, সেটার মূল হচ্ছে বৈদিকতা। তাই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিশা পেতে হলে বৈদকতাকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে। তবেই পতিতরা জেগে উঠতে পারবে। তা না হলে এঁরা বৈদিকতার মায়া জ্বাল থেকে এবং মানষিক গোলামী থেকে মুক্তি পাবেনা।

আর এর জন্য তিনি ঠিক করলেন-   

বেদবিধি সংস্কার তাই ঝেড়ে ফেলে।

মতুয়ার আঙিনাতে আনিল সকলে।।

                                                         (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ২৭১)

অর্থাৎ বেদ বিধির সংস্কার থেকে মুক্ত করে নতুন ধর্ম, ‘মতুয়া ধর্ম’-এর আঙিনায় সকলকে আনতে হবে। যেখানে সব কিছু থাকবে বৈদিকতা মুক্ত।

    তিনি তাঁর ধ্যানকে আরও গভীর করে আর এক চরম বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করলেন। সেটা হচ্ছে-

তুমি স্থূল আমি সূক্ষ্ম উভয়ে অভিন্ন।

                       দেহ আত্মা মোরা দোঁহে মূলে নহি ভিন্ন।।

                                            (লীলামৃত, ঠাকুরনগর প্রকাশ ২০০৯ পৃষ্ঠা নং- ৭৩)

অর্থাৎ তুমি হচ্ছে এখানে আমার শরীর।  এই শরীরটা হচ্ছে স্থূল। স্থূল অর্থাৎ বড় কায়া বা অবয়বআর আমি হচ্ছে এখানে আমার এই দেহের ভিতরের চেতনা শক্তি যাকে আত্মারূপে তুলে ধরা হয়েছে। এই আত্মা হচ্ছে সূক্ষ্ম। আর এই দেহ এবং আত্মা একে অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। একের সঙ্গে অন্যটা মিশে আছে। দেহ বিনা আত্মার অস্তিত্ত্ব সম্ভব নয়। যার ফলে দেহের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে আত্মারও মৃত্যু ঘটে। দেহের বাইরে আত্মার অস্তিত্ত্ব বলে কিছু নেই। তবে একটা প্রদীপ থেকে যেমন অসংখ্য প্রদীপ জ্বালানো যায়; তেমনি প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একের বিনাশের সঙ্গে সঙ্গে যে অন্য জীবের উৎপত্তি প্রক্রিয়া শুরু হয়, এই উৎপত্তি ও বিনাশের System কে হরিচাঁদ উপলব্ধি করতে পারেন, এই যে যে, System এই System এর মূল হচ্ছে পঞ্চ ভুতের চার ভুত। ক্ষিতি, অপ, তেজ ও মরুৎ এই চার ভুতের প্রামাণিক মিলনেই জীবের সৃষ্টি হয়। আবার  মৃত্যুর পরে এই চার ভুতে বিলিন হয়ে যায়।

     হরিচাঁদ এই চরম বিজ্ঞানকে ধ্যানের মাধ্যমে উপলব্ধি করেন। তিনি তাঁর অন্তরআত্মা দিয়ে আরও উপলব্ধি করেন-

তুলিয়া নামের ঢেউ প্রেম প্লাবনেতে।

ধুয়েমুছে নিব সব নাম প্রবাহেতে।।

                                         (লীলামৃত, ঠাকুরনগর প্রকাশ ২০০৯ পৃষ্ঠা নং ৭৩)

অর্থাৎ অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করার জন্য নাম এর বন্যা বইয়ে দিতে হবে। যে নামের প্রেমের বন্যার প্লাবনে বৈদিকতার সকল কলুষতা ধুয়ে মুছে যাবে।

     এখানে এই নাম হচ্ছে- বিজ্ঞান তাই বিজ্ঞানে আশ্রয় নিয়ে যুক্তিবাদী ভাবনায় ভাবিত হয়ে যদি কাজ করা যায়; তাহলে এই বিজ্ঞানের আলোতে অজ্ঞানতার অন্ধকারকে দূর করে দিয়ে নতুন দিশা দেখাবে।

আর সেই দিশা পাওয়ার জন্য কোনো কানেমন্ত্র দেওয়া গুরুর প্রয়োজন হবেনা। মানুষের দেহমন শুদ্ধ হলে আত্মাও স্থির হবে। প্রেমের প্লাবনে মনের মধ্যে জমে থাকা অজ্ঞানতার মৃত্তিকা সরস হবে। সেখানে সোনার ফসলের আবাদ করা যাবে। অর্থাৎ সঠিক জ্ঞানের বীজ বপন করা যাবে

এইভাবে নিশি ভোর ভাবে অচৈতন্য।

আত্মস্থ হইল প্রভু জীব মুক্তি জন্য ।।

                                               (লীলামৃত, ঠাকুরনগর প্রকাশ ২০০৯ পৃষ্ঠা নং ৭৪)

এইভাবে সারা রাত ধ্যানস্ত অবস্থায় থেকে হরিচাঁদ প্রাতে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মানুষকে বৈদিকতার এবং অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে মুক্তি দেওয়ার সমাধান বের করে আত্মস্থ হন। 

এই যে যে, ঘটনা প্রবাহ এটাকে আমরা কিন্তু মহামানব গৌতম বুদ্ধের ভাবনা ও মানুষের জন্য জ্ঞানের আলোক প্রকাশের প্রক্রিয়ার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই। কারণ গৌতম বুদ্ধও বট বৃক্ষের নিচে বসে গভীর ধ্যানে মগ্ন হয়ে মানুষের দুঃখ ও তার থেকে মুক্তির কারণ উদ্ভাবন করে ছিলেন। আর পরবর্তিতে তিনি মানুষের কল্যানে ব্রতী হয়েছিলনে। যার জন্য তাঁকে বুদ্ধ অর্থাৎ জ্ঞান বলা হয়। যিনি এই জ্ঞান প্রাপ্ত হন তাঁকে বুদ্ধ বলা হয় যেমন গৌতম বুদ্ধের পূর্বে এই জ্ঞান প্রাপ্তদের সংখ্যা ছিল ২৭। অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধের পূর্বে আরো ২৭ জন বুদ্ধ ছিলেন। আমরা এই ক্ষেত্রে মহামানব হরিচাঁদকেও বুদ্ধ বলতে পারি। যার জন্য লীলামৃতের প্রথমেই আমরা দেখতে পাই কবি তারক সরকার লিখেছেন-বুদ্ধের কামনা পুর্ণ করার ব্রত নিয়েই  হরিচাঁদ ঠাকুর সকল মানুষের কল্যাণের কর্মে ব্রতী হয়েছেন। 

মুক্তির অনুসন্ধানে হরিচাঁদ

    হরিচাঁদ শৈশবে যেমন লুকিয়ে গাছের নিচে বসে ধ্যান করতেন; যৌবনে সেই ধ্যানের পরিধি আরও বেড়ে যায়। মাঝে মাঝেই তিনি ধ্যানে মগ্ন হয়ে যান। অনেক প্রশ্নের কারণ ও সমাধান নিয়ে চিন্তা মগ্ন থাকেন।

    তিনি অনুধাবন করেন, নিম্ন শ্রেণির মানুষকে নিপীড়ন করার জন্যই তথাকথিত ধর্মগ্রন্থ  লিখে তাদেরকে শিক্ষা সম্পত্তি ও অস্ত্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। মানুষকে ধর্মীয় শৃংখলে আবদ্ধ করে গোলাম করে রেখেছে।

    এক সময়ের বাংলার শৌর্য-বীর্য ও প্রতিপত্তিশালী নমঃজাতিকে  ধর্মহীন পতিত করে চন্ডাল, অস্পৃশ্য নাম দিয়ে এদের কেন  সমাজের সর্ব নিম্ন স্তরে নামিয়ে রেখেছে? এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেন,  ১১৩০ সালের পূর্বে বাংলায় ব্রাহ্মণদের প্রবেশে যারা বাঁধা দিয়েছিল, তারা হচ্ছে, নমঃজাতির লোক।  বাংলায় যে পাল রাজাদের শাসন ছিল, সেটা প্রায় ৪০০ বছর ধরে চলেছিল। এই পাল রাজারা ছিল বৌদ্ধ ধম্মাবলম্বী। আর এই পাল রাজাদের প্রশাসনিক কাজকে যারা  সবদিক দিয়ে সমর্থন ও সহযোগীতা করে ছিল, তারা ছিল নমঃজাতির লোক। এরাও বৌদ্ধ ধম্মাবলম্বী ছিল।

     তখন মানুষের মধ্যে জ্ঞানবৃদ্ধির সবরকমের সাধন ছিল। মানুষের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিলনা। কিন্তু পাল রাজত্বের শেষ দিকে কালের বিবর্তনে পাল রাজত্বের অবসান ঘটতে থাকে।  এই সুযোগে বাংলায় সেন বংশের প্রভাব বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে বল্লাল সেনের সময় বাংলার নমঃদের প্রতি অমানবিক অত্যাচার শুরু হয়। কারণ নমঃজাতির লোকেরা ব্রাহ্মণ্যধর্মকে স্বীকার করতে রাজি হয়নি। এক সময়ের প্রতিপত্তিশালী নমঃজাতির লোকেরা-

রাজশক্তি খর্ব হয়ে যাওয়ার ফলে এরা দুর্বল হয়ে যায়। মনের দৃঢ়তা নষ্ট হয়ে শক্তিহীন হয়ে যায়। আর নিজেদের পূর্বপুরুষের বৌদ্ধধম্মের আচার আচরণও প্রকাশ্যে করতে পারেনা। এদিকে অন্য ধর্মেও প্রবেশ করতে পারেনা। এরকম সংকটময় কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ধর্মচ্যুত হয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। নিজের ধর্মতো দূরের কথা অন্য ধর্মও পালন করতে পারেনা। যার ফলে ধীরে ধীরে এক সময়ের উজ্জ্বল অতীতকে এরা ভুলে যেতে থাকে। এইভাবে এরা ধর্মহীন হয়ে পতিতে পরিত হয়। কারণ যারাই ধর্মহীন হয়, তাদের পতিত হিসাবে গন্য করা হয়। তাছাড়া এরা শুধু ধর্ম থেকেই পতিত হয়নি; এদের এক সময়ের মান-মর্যাদা শৌর্য-বীর্য যে শীর্ষস্থানে ছিল, তার থেকেও  এরা পতিত হয়ে যায়।  

    এই ইতিহাস হরিচাঁদ ঠাকুর যখন উপলব্ধি করতে পারলেন; তখন বুঝলেন এক সময়ের এই মান-মর্যাদা সম্পন্ন, শৌর্য-বীর্যশালী লোকেরা আত্মবিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়ার ফলে-

আজ এরা নিজেদের অস্তিত্ত্বকে ভুলে গিয়ে অলীক কাহিনী নিয়ে গুরুবাদের আফিম খেয়ে বৌদ্ধিক চেতনার অকাল মৃত্যুকে ডেকে এনেছে। আর এরা এই অলীকের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছে  দিবারাত্র। যার ফলে এদের সমস্ত বৌদ্ধিক চেতনা লুপ্ত হয়েগেছে।  এরা বিভিন্ন ধর্মের খোঁয়াড়ে বন্দি হয়ে পড়েছে। আর এই সব কিছু ঘটেছে বিদ্যাহীনতার জন্য।

    পরে এদের অনেকেই ধীরে ধীরে অন্যধর্ম গ্রহণ করে। বাংলায় যে মুসলমান ও খৃষ্টান লোক  দেখা যায়; যার বেশিরভাগ হচ্ছে এই পতিতরা।

পৃথিবীর সুপ্রাচীন এই সভ্য নরজাতির করু পরিস্থিতিকে হরিচাঁদ হৃদয়ে অনুভব করে শিহরিয়া ওঠেন।  

ঠাকুরের অন্তরাত্মা দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তাই তিনি এই তিতদের গভীর সংকট থেকে মুক্ত করার জন্য গভীর ভাবনায় পড়ে যান।

কীকরে এই পতিতদেরকে বিপদ থেকে মুক্ত করা যায়, এই কথাভেবে প্রায়ই তিনি চিন্তায় মগ্ন থাকেন। এর জন্য তিনি গভীর ধ্যানের মধ্যে ডুবে গিয়ে দেখতে পান-

পূর্বের ভারত প্রভু দেখে ধ্যানালোকে।

আলোকিত সে ভারত বৌদ্ধিক আলোকে।।

_______________________

যাগ-যজ্ঞ দেব-দেবীপূজা আদি নাই।

                          ন্যায়-নৈতিকতা নিয়ে চলে যে সবাই।।      

 (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ৩০১)

পূর্বের ভারত (পূর্ববুদ্ধকালীন) ছিল বৌদ্ধময় ভারত। সেখানে সকলে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। কোন বর্ণাশ্রম বা চতুরাশ্রম বলে কিছু ছিলনা। আর কোন দেব-দেবীর পূজা ও যাগ-যজ্ঞ হতো না। সকলে ন্যায় ও নৈতিকতার উপর জীবন যাপন করত। সেখানে মনুষ্যত্বই শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে বিবেচিত হত। তবে পরবর্তীতে বৈদিকবাদীরা ভারতে আক্রমন করে এই  বৌদ্ধময় ভারতকে ধ্বংস করে ব্রাহ্মণ্য ভারতে রূপান্তরিত করে।

এরকম বৈদিকতার অন্ধকারময় সময়ে গৌতমবুদ্ধের জন্ম হয়। যিনি হচ্ছে ২৮তম বুদ্ধ তিনি বৈদিকতার এই আচার সর্বস্ব ধর্মের পৈশাচিকতাকে রুদ্ধ করেদেন। যুক্তি-জ্ঞান ও বিজ্ঞানে পূর্ণ করে বৌদ্ধধম্মের প্রচলন করেন। শুরু করেন সমতা-সতন্ত্রতা বন্ধুত্বতা ও ন্যায়ের প্রচার। যেখানে নেই কোন জাতিভেদ, উচ্‌-নীচ্‌ ভেদাভেদ। কিন্তু বুদ্ধের এই মানবতাবাদী ধর্মও বৈদিকেরা টিকতে দিলনা।

সে ধর্ম করিতে হত্যা বৈদিক ঘাতক।

                               আক্রমণ করে একে ব্রাহ্মণ্য পাতক।।   (ঐ পৃষ্ঠা নং ৩০৩) 

এই ধম্মের ধব্জাকে এক ব্রাহ্মণ পাতক হত্যা করে শেষ করে দেয়। শুধু তাই নয়, ভারতে এই ধম্মের পালন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু নিষিদ্ধ করা সত্বেও যখন দেখল পূর্ণ উদ্দেশ্য সিদ্ধি হচ্ছেনা, তখন -            কৌশলেতে করে একে বৈদিক করণ।

                                  নাম মাত্র রয়ে গেল বৌদ্ধ আবরণ।। (ঐ) 

অর্থাৎ বৌদ্ধ ধম্মটা শুধু নামমাত্র থেকে গেল। এটাকে বৌদিকবাদীরা সম্পূর্ণ বৈদিকের ঢাচে তৈরি করে তুলে ধরে। আর ধীরে ধীরে বুদ্ধের আদর্শকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।

ভারতের বাইরে আজও যত বৌদ্ধ ধম্মাবলম্বী দেশ আছে, সেখানের বৌদ্ধ জনসংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার থেকে কয়েক গুণ বেশি। তবে তারাও ভোগবাদে মিশে গিয়ে বৌদ্ধের সঠিক আদর্শ থেকে সরে গেছে। তবে একথা আজও সত্যি যে, হরিচাঁদ ঠাকুর বুঝতে পারলেন যে, এই বিশ্বে আজও যত নির্যাতিত লোক আছে অথবা যারা ধর্মহীন হয়ে পতিত হয়ে পড়ে আছে, এদের সকলের মুক্তির মন্ত্র কিন্তু এই বুদ্ধের ধম্মের মধ্যে বিরাজ করছে। তবে সমস্ত বিশ্বের মুক্তির জন্য তাহার সাধনা এখনও পূর্ণ হয়নি। তাই তিনি বুদ্ধের সেই অপূর্ণ কামনাকে পূর্ণ করার জন্য জগতের সামনে নববুদ্ধরূপে হরিচাঁদ নামে আত্মপ্রকাশ করলেন।

বুদ্ধের কামনা পরিপূর্ণ করার জন্য মতুয়া ধর্মের স্থাপন।

হরিচাঁদ ঠাকুর দীর্ঘক্ষণের গভীর ধ্যান থেকে ধীরে ধীরে গাত্রোত্থান করেন। তিনি অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ও তার কারণ বুঝতে পারলেন। আর মনের মধ্যে যে ভাবনার ঘন মেঘ জমে ছিল; আজ যেন সেই মেঘ, বৃষ্টি হয়ে ঠাকুরের মনকে শীতল করেদিল। তিনি ঠিক করলেন,-

সর্ব অগ্রে পতিতের দিতে হবে ধর্ম।

                               পরাইতে হবে আগে ধর্মরূপ বর্ম।।

                                                                         (হরিচাঁদ তত্ত্বামৃত পৃষ্ঠা নং ৩০৪)

প্রথমে এই ধর্মহীন পতিতদের একটা ধর্ম দিতে হবে। সেই ধর্মের নিয়ম নীতির মধ্য দিয়ে এদের আসল মনুষ্যত্বের উপলব্ধি দিতে হবে। এই পতিতরা তাদের ধর্মের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান হতে শুরু হবে। এরা ধর্মীয় দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে মুক্তচিন্তা ভাবনার প্রসার ঘটাতে পারবে। কারণ আত্ম চেতনার উন্মেষের ফলে জ্ঞানের উদ্ভব হয়। আর সঠিক জ্ঞানই পারে সঠিক দিশা নির্দেশ করতে। হরিচাঁদ তাঁর ধর্মকে সাজাতে গিয়ে দেখেন-

ভুমন্ডলে যত ধর্ম দেখে হরিচাঁদ।

সব ধর্ম চেখে পায় অলীকের স্বাদ।।  (ঐ ৩০৫)

পৃথিবীর সব ধর্মের মধ্যেই অলীক কল্পনার কাহিনী বিরাজ করছে। তিনি তার মধ্যে একটা মাদকতার গন্ধ অনুভব করেন। যে মাদক বাস্তব অস্তিত্বের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে অবাস্তব অলীকের কল্প-কাহিনীর প্রতি আকর্ষিত করে। এ সব ধর্ম, পঞ্চভুতের অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ মরুত ও ব্যোম-এর বিজ্ঞান ভিত্তিকে স্বীকার না করে অকল্পনীয় কথায় ভরা। 

হরিচাঁদ উপলব্ধি করেন,- দাসত্বের শ্রেষ্ঠ দাস্য ধর্মীয় দাসত্ব

                                 এখানে মূল্যহীন সকল ব্যক্তিত্ব।। (ঐ)

সব থেকে বড় দাসত্ব হচ্ছে- ধর্মের দাসত্ব। এই দাসত্বের কাছে মানুষের ব্যক্তিত্বের কোন মূল্য নেই। তবে তিনি বৌদ্ধ ধম্মে এর ব্যতিক্রম দেখতে পান-

একমাত্র বৌদ্ধ মতে ইহা খুঁজে পায়।

মানুষের জন্য ধর্ম অন্য কিছু নয়।।

ধর্ম লাগি নর নহে নর লাগি ধর্ম।

একমাত্র বৌদ্ধ মতে পায় এই মর্ম।। (ঐ ৩০৬) 

হরিচাঁদ নতুন ধর্মমত স্থাপন করার জন্য যে মানিক রতন খুঁজছিলেন, সেটা তিনি বৌদ্ধ ধম্মের মধ্যে খুঁজে পান। কার বিশ্বে বৌদ্ধ ধম্মই একমাত্র ধম্ম যেখানে ধম্মের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য ধম্ম। মানুষের বৌদ্ধিক বিকাশের জন্য যে নীতি আদর্শের প্রয়োজন, সেটা একমাত্র বৌদ্ধ ধম্মেই দেখতে পান। এই ধম্ম পৃথিবীর সব থেকে শ্রেষ্ঠ ও পুরাতন ধম্ম। আর এটাই সূক্ষ্ম সনাতন ধম্ম। এ সব উপলব্ধি করতে পেরে হরিচাঁদ এই বৌদ্ধ ধম্মের নীতি আদর্শকে তার ধর্ম স্থাপনার জন্য গ্রহ করলেন। তাছাড়া বৌদ্ধ ধম্ম পঞ্চভুতের আধারে নির্মিত। বিশ্বের সবকিছু এই পঞ্চভুত নিয়ে তৈরি। এর মধ্যে কোন অলৌকিকতা নেই। পৃথিবীর সমস্ত মানব তথা প্রাণী কুলের জন্য এই ধম্ম হচ্ছে শ্রেষ্ঠ ধম্ম।

     তবে বর্তমানে এই ধম্ম মত বৈদিকতার অনুপ্রবেশে কলুষিত হয়েগেছে। বৈদিকতার প্রবেশের ফলে এর মধ্যে অনেক অলৌকিক গল্প-কাহিনীতে ভরেগেছে। বুদ্ধের সঠিক নীতি আদর্শ ও যুক্তিবাদ থেকে মানুষ সরে গিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের ঢাচার মধ্যে বন্দি হয়ে পড়েছে। এই ব্রাহ্মণ্যবাদের দুষণ থেকে বৌদ্ধ ধম্মকে মুক্ত করা প্রায় অসম্ভব মনে করে হরিচাঁদ নতুনভাবে বৌদ্ধ ধম্মের যত কিছু অমূল্য রতন আছে সেটাকে গ্রহণ করলেন। আর এর মধ্যে যে বেদবিধির গন্ধ লেগে আছে সেটা থেকে মুক্ত হয়ে হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮৩০ সালে ১৮ বছর বয়সে মতুয়াধর্মনামে নতুন ধর্মের স্থাপন করেন।

নামে প্রেমে মাতোয়ারা মতুয়ারগণ।।

                             ভিন্ন সম্প্রদায় রূপে হইবে কির্তণ।।

বিবাদীরা বলে ওরা হ’য়েছে পাগল।

কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান নাহি বলে হরিবোল।।

হরিবোলা দেখে উপহাস করে কত।

সবে বলে ও বেটারা হরিবোলা ম’তো।।

কেহ বলে জাতিনাশা সকল মতুয়া।

দেশ ভরি শব্দ হ’ল মতুয়া মতুয়া।।

অন্য কেহ যদি হয় হরিনামে রত।

সবে করে উপহাস অই বেটা মতো।।

অন্য অন্য গ্রাম আড়োকাঁদি ওঢ়াকাঁদি।

সে হইতে হ’য়ে গেল ‘মতুয়া’ উপাধি।।

তাহা শুনি ডেকে বলে প্রভু হরিচাঁদ।

ভিন্ন সম্প্রদায় মোরা ‘মতুয়া’ আখ্যান। -শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত পৃষ্ঠা ৬৭

পতিত পাবন হরিচাঁদ ঠাকুর যখন ততকালীন সামাজিক পঙ্কিলতাকে উপলব্ধি করলেন তারঁ দূর দৃষ্টি (Vision) দিয়ে; তখন সমাজের পিছিয়ে রাখা মানুষদের মনুষত্বের স্তরে তুলে ধরার জন্য তাদের ধর্মহীন অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য উদ্ভাবন করলেন সহজ সরল নিয়ম কানুন ও সামাজিক জাগরণ মূলক এক মতবাদ যার নাম দিলেন মতুয়া বাদ বা মতুয়া ধর্ম।

     যে ধর্মের মধ্যে উল্লেখিত হয়েছে-

 বারটি(১২) আজ্ঞা বা আদেশ যাকে বলা হয় দ্বাদশ আজ্ঞা

সেগুলো নীচে দেওয়া হল-

 (১) গার্হস্থ্য ধর্ম পালন বা এক নারী ব্রহ্মচারিঃ

                                     করিবে গার্হস্থ্য ধর্ম লয়ে নিজ নারী।

                                     গৃহে থেকে সন্ন্যাসী বানপ্রস্থ ব্রহ্মচারী ।।

(২) সত্য কথা বলাঃ                  গৃহধর্ম রক্ষা করে বাক্য সত্য কয় ।

                                     বানপ্রস্থী পরমহংস তার তুল্য নয় ।

(৩) পর দুঃখে দুঃখী হওয়া এবং দুঃখীকে সহযোগিতা দানঃ

                                     পরনারী মাতৃতুল্য, মিথ্যা নাহি কবে ।

                                     পরদুঃখে দুঃখী সদাই সচ্চরিত্র রবে ।।

(৪) সাধন, ভজন, দীক্ষা, তীর্থ পর্যটন প্রভৃতি আচার সর্বস্বতা পরিত্যাগ করাঃ

                                     দীক্ষা নাই, করিবে না তীর্থ পর্যটন ।

                                     মুক্তিস্পৃহা শূন্য, নাহি সাধন ভজন ।।

(৫) ভাবের আবির্ভাবঃ                গৃহেতে থাকিয়া যার ভাবোদয় হয় ।

                                     সেই সে পরম সাধু জানিবে নিশ্চয় ।

(৬) গৃহধর্ম ও গৃহকর্ম  করাঃ          গৃহধর্ম গৃহকর্ম করিবে সকল ।

                                     হাতে কাম মুখে নাম ভক্তিই প্রবল ।।

(৭) জ্ঞানতত্ত্বঃ                         কিবা শূদ্র কিবা ন্যাসী কিবা যোগী কয় ।

                                      যেই জানে আথতত্ত্ব সেই শ্রেষ্ঠ হয় ।।

(৮) জীবের প্রতি দয়া করা ও মানুষের প্রতি নিষ্ঠা রাখাঃ

                                     জীবে দয়া নামে রুচি মানুষেতে নিষ্ঠা ।

                                     ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা ।।

(৯) উদ্ধার কর্তাকে(হরিচাঁদ)ঈশ্বর মনে করাঃ 

                                    বিস্বভরে এই নীতি দেখি পরস্পর ।

                                    যে যারে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর ।।

(১০) কর্ম ও ধর্মের সমন্বয় সাধনঃ

                                    মালাটেপা ফোটাকাটা জলফেলা নাই ।

                                     হাতে কাম মুখে নাম মনখোলা চাই ।।

(১১) পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, দেহ ও মনশুদ্ধ রাখাঃ

                                    নরনারী প্রাতঃস্নান অবশ্য করিবে ।

                                    দেহশুদ্ধি চিত্তশুদ্ধি অবশ্য আসিবে ।।

(১২) সংযম রাখাঃ                   পরপতি পরসতী স্পর্শ না করিবে ।

                                    না ডাক হরিকে, হরি তোমাকে ডাকিবে ।।

হরিচাঁদ নির্দেশিত এসব গুণের অধিকারী একজন গৃহী হয়ে ওঠা আসল কথা। এসব গুণের অধিকারী কোন গৃহী হরিকে না ডাকলেও হরি তাকে ডাকবেন।

উপরে উল্লেখীত নির্দেশগুলোকে দ্বাদশ আজ্ঞা বলা হলেও এরকম আরো বেশ কিছু আজ্ঞা বা নির্দেশ আছে লীলামৃতের পাতায় পাতায়।

    এই আদেশের সঙ্গে সাতটি নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হল, যাকে বলা হয়

  সপ্ত নিষেধাজ্ঞা।

 সে গুলো হলঃ- (১)ভিন্ন গুরু ও ভিন্ন দল না করাঃ

                                     মতুয়ার এক গুরু ভিন্ন গুরু নাই।

                                     মধ্যস্বত্ত্ব জমিদারি ধর্মক্ষেত্রে নাই ।।

                                     ভিন্ন ভিন্ন দল কেহ করো না গোসাই।

(২) নারী দিয়ে অঙ্গ সেবা না করাঃ     নারী দিয়ে অঙ্গসেবা হবে ধর্মক্ষয়।

                                     তেল ঘসা অঙ্গসেবা মহা ব্যাভিচার।

(৩) পরনারীকে মাতৃ জ্ঞান করে দূরে থাকা।

(৪) পরিহাস বাচালতা কখন না করা।

(৫)মদ গাঁজা ন খাওয়া এবং চুরি না কর ।

(৬) তাস-দাবা-জুয়া খেলা সব ছেড়ে দিতে হবে

(৭) কাউকে  ভয় করার দরকার নেই।

                                    হরি বলে ডঙ্কা মার শঙ্কা কর কারে।

                                    শ্রীহরি সহায় তব,  সাথে সাথে ফেরে।।

এছাড়া- ভেকধারী বৈরাগীকে ভিক্ষা দিতে মানা করা হয়েছে, কারণ তাদের ভীক্ষা দিলে ব্যাভিচার আরো বেড়ে যাবে।

 আবার বেদের বিধান ও আচার বিচারকে না মানতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

    এই আদেশ ও নিষেধগুলো পালন করার নির্দেশ এইজন্য দেওয়া হল যাতে মানুষ তার মনুষত্বকে খুঁজে পায়। অলীকতার পিছনে বোকার মত ঘুরে না বেড়ায়।

বাণী

ঠাকুর আবার বাণী দিচ্ছেন-  ঠাকুর কহেন বাছা ধর্ম কর্ম সার।

                           সর্ব ধর্ম হতে শ্রেষ্ঠ, পর উপকার। (লীলামৃতে(পৃষ্ঠা নং ১৫০)

 

জীবে দয়া, নামে রুচি, মানুষেতে নিষ্ঠা।

                             ইহা ছাড়া আর যত সব ক্রিয়া ভ্রষ্টা।।

                                               (লীলামৃত ১ম সংস্করণ পৃষ্ঠা নং- ১১)

 

সত্যবাদী জিতেন্দ্রিয় হইবেক যেই।

                               না থাকুক ক্রিয়া কর্ম হরিতুল্য সেই।। 

(লীলামৃত ১ম সংস্করণ পৃষ্ঠা নং- ১৪৩)

 সবচেয়ে যুগান্তকারী যুক্তিবাদী দার্শনিক যুক্তি হল-

যে যাহারে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর।

গৃহ ধর্ম গৃহ কর্মঃ-

হরিচাঁদের জীবন চরিতের ভাষ্যকার তারক চন্দ্র সরকার লিখেছেন-

                        মালা-টেপা ফোটা কাটা জল-ফেলা নাই।

                         হাতে কাম, মুখে নাম, মন-খোলা চাই।।

                         সহজ গার্হস্থ্য ধর্ম সর্বধর্ম সার।

                         গৃহীকে বিলাতে মুক্তি শ্রীহরি আমার।।

    ঠাকুর হরিচাঁদ যে মুক্তির বাণী সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচারিত ও প্রসারিত করতে চেয়েছেন সে মুক্তি বৈরাগ্যের মধ্যে মুক্তির সন্ধান নয়, সে মুক্তি সহজ গার্হস্থ্য ধর্ম সকল ধর্মের সার, গৃহী জীবনের মধ্যে মুক্তির সন্ধান।

চিকিৎসা বিষয়ঃ-

আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর পূর্বে চিকিৎসা ব্যাবস্থার প্রচলন ছিল ভীষণ কম। কিন্তু রোগ ব্যাধী তো লেগেই থাকত। কারণ তখনকার জল-জঙ্গল- জন্তুর সঙ্গে সংগ্রাম করা লোকেরা কোন পুথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল না। তাই চলত গ্রাম্য চিকিৎসা বা যাকে বলা হত কবিরাজি চিকিৎসা। কিন্তু সেই সময়ে আমরা যদি হরিচাঁদ ঠাকুরের চিকিৎসা পদ্ধতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই যে, সেই পদ্ধতি কিন্তু বর্তমান বিজ্ঞান ভিত্তিক পদ্ধতির সঙ্গে মিলে যায় ।

জাতিভেদ প্রথার বিলুপ্তিঃ-

হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্মযুদ্ধে যে ধর্মের প্রতিষ্ঠা সূচিত হল তাতে কোনো উঁচু জাতি, নিচুজাতি, অস্পৃশ্যতা, ভেদাভেদের কোনো স্থান নেই। জাতি বৈষম্যকে তিনি ঘৃণার চোখে দেখতেন। তাঁর ধর্ম বিপ্লবে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে। মানুষই দেবতা। মানুষের অসম্মান, অমর্যাদা যে ধর্মে প্রকটিত সেই ধর্মকে তিনি প্রকৃত ধর্ম বলে স্বীকার করেন নি। মতুয়া ধর্মযুদ্ধের মূল কথাই হল-

নরাকারে ভূমন্ডলে যতজন আছে।

                             একজাতি বলে মান্য পাবে মোর কাছে।।

                             মানুষে মানুষে বল ভিন্নজাতি কোথা।

                               নরজাতি একজাতি ভেদ করা বৃথা।।” (গুরুচাঁদ চরিত)

শিক্ষাঃ- বৃহত্তর পিছিয়ে পড়া যে জনসমাজ  তার সামগ্রিক কল্যাণের জন্য সবচেয়ে বড় যে জিনিসটা আমরা লক্ষ্য করছি, সেটা হচ্ছে, শিক্ষাবর্তমান সময়ে আমরা সর্বজনীন শিক্ষার জন্য মাথা খুঁড়ছি, আমরা দেখছি, মানুষের মুক্তির সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সর্বজনীন শিক্ষা। ধর্মের মোহ এবং অশিক্ষা এই দুটো অজগর সাপ যখন মানুষকে বেষ্টন করে থাকে তখন তার সামনে তাকিয় দেখার জন্য দৃষ্টি আর প্রসারিত হয় না। সেই জগদ্দল পাথরকে সরানোর কাজ শুরু করেন হরিচাঁদ ঠাকুর। আর এই শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য স্বীয়পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুরকে নির্দেশ দেন। কারণ, শিক্ষা বিনা তো কোনো বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্ভব হতে পারেনা। আর ধর্মীয় কুসংস্কারই মানুষকে ডুবিয়ে রাখে অযৌক্তিক অন্ধকারের জগতে। তিনি প্রথমেই এই দুটি স্থানে আঘাত করেন।

পরবর্তীতে আমরা দেখি, গুরুচাঁদ ঠাকুর পিতার আজ্ঞা শিরোধার্য্য করে শিক্ষার জন্য আন্দোলন করেন এবং এই শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেন। সে সম্পর্কে আমার লেখা ‘গুরুচাঁদ ঠাকুরের শিক্ষা আন্দোলন’ বইতে বিস্তারিত দেওয়া আছে।

মহাপরিনির্বাণঃ- হরিচাঁদ ঠাকুর 1878 সালের 6 ই মার্চ বুধবার ওড়াকান্দি গ্রামে, মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন।

উপসংহার

মহামানব হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন ও দর্শন কেবল মতুয়া সমাজের ইতিহাস নয়; বরং ভারতবর্ষের সামাজিক নবজাগরণ, মানবমুক্তি, সাম্য, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন ভারতীয় সমাজ জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় আড়ম্বর, কুসংস্কার এবং সামাজিক শোষণের কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। এমন এক প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশে হরিচাঁদ ঠাকুর মানুষকে তার প্রকৃত স্বরূপের পরিচয় দিয়েছিলেন এবং দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন— মানুষই ধর্মের কেন্দ্র; ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়।”

তিনি অলৌকিকতা, আচারসর্বস্ব ধর্ম কিংবা পরলোকের মোহময় স্বপ্নের প্রচার করেননি; বরং সত্য, যুক্তি, শ্রম, শিক্ষা, নৈতিকতা, মানবসেবা এবং সামাজিক সাম্যকেই মানবজীবনের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর প্রদত্ত হাতে কাম, মুখে নাম”, জীবে দয়া, মানুষেতে নিষ্ঠা” এবং যে যাহারে উদ্ধার করে, সে তার ঈশ্বর”এই চিরন্তন বাণীগুলি আজও মানবতাবাদী দর্শনের অমূল্য সম্পদ। এই বাণীগুলোর মধ্যে কোনো ধর্মীয় সংকীর্ণতা নেই; বরং রয়েছে সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিক জীবনচর্চা এবং মানবমর্যাদার সর্বজনীন আহ্বান।

হরিচাঁদ ঠাকুর গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, কোনো সমাজের প্রকৃত উন্নতির মূলভিত্তি হলো শিক্ষাতাই তিনি তাঁর উত্তরসূরি গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাতে শিক্ষা বিস্তারের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের মধ্যে জ্ঞানজাগরণের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের সূচনা করেন। পরবর্তীকালে এই আন্দোলনই সামাজিক চেতনা, আত্মমর্যাদাবোধ, সংগঠনশক্তি এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে ওঠে।

এই লেখায় হরিচাঁদ ঠাকুরের জীবন, তাঁর চিন্তাধারা, মতুয়া ধর্মের প্রতিষ্ঠা, জাতিভেদ প্রথার বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম, শিক্ষা-দর্শন, মানবতাবাদ, সমাজসংস্কার এবং ঐতিহাসিক অবদানকে কেবল ভক্তিভাবের দৃষ্টিতে উপস্থাপন করা হয়নি; বরং ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, যুক্তি এবং প্রামাণ্য তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো বিশেষ মতবাদ বা সম্প্রদায়ের প্রচার নয়; বরং সেই ঐতিহাসিক সত্যকে তুলে ধরা, যা কোটি কোটি অবহেলিত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জীবনে আত্মমর্যাদাবোধ, আত্মবিশ্বাস এবং নবচেতনার সঞ্চার করেছিল।

              _____________________________________

 























Comments