শিক্ষা ও নারীর অধিকারে দুই মহামানব- ড. বাবা সাহেব আম্বেদকর ও গুরুচাঁদ ঠাকুর
লেখক– জগদীশচন্দ্র রায়
ড. বাবা সাহেবের জীবন ও কর্ম
জন্মঃ- ১৪ই এপ্রিল ১৬৯১ সালে। পিতার নাম রামজী শকপাল। বাল্য নাম ভীমরাও। তিনি এক অচ্ছুৎ দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে স্কুলে
তাঁকে সর্বদা জাতি বৈষম্যের শিকার হতে হতো। অস্পৃশ্য বলে বর্ণবাদীরা তাঁকে স্পর্শ
করত না। পিপাসার জলও পান করতে পারতেন না।
তিনি ছিলেন ভারতীয় সংবিধান নির্মাতা। ২০১২ সালে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয়দের ভোটের দ্বারা তিনি “শ্রেষ্ঠ ভারতীয়” নির্বাচিত হন।
শিক্ষা ও সম্মান প্রাপ্তিঃ--
১৯১৫ সালে কলম্বিয়া উনিভারসিটি থেকে এম. এ. পাশ করেন। ১৯১৭ সালে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী পান।
১৯২১ সালে এম.এস.সি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯২২ সালে ব্যারিষ্টারী পাশ করেন। ১৯২৩ সালে ডি.
এসসি ডিগ্রী পান ‘টাকার সমস্যা’ নিয়ে
থিসিস লিখে লণ্ডন উনিভারসিটি থেকে।
ভারতের সংবিধান রচনার জন্য কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি.লিট (ডক্টর অব ল)
প্রদান করেন। তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্যের জন্য ভারতের মুসলমান পরিচালিত ওসমানিয়া
বিশ্ববিদ্যালয় ডি.লিট(ডক্টর অব লিটারেচার) সাম্মানিক ডিগ্রী প্রদান করেন। কিন্তু
ভারতের উচ্চবর্ণীয়দের দ্বারা পরিচালিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এরূপ সম্মান
প্রদান করেনি। নিচুজাত বলে গুণি আম্বেদকরকে তাঁরা কোনো দিনই এই ধররনের দিতে পারেননি
এবং আজ পর্যন্ত দেননি। তবে ২০১২ সালে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভারতীয়দের ভোটের দ্বারা তিনি “শ্রেষ্ঠ ভারতীয়” নির্বাচিত
হন। আর Apr
26, 2016 Baba Saheb
Ambedkar is considered as SYMBOL OF KNOWLEDGE in the world.
বাবা সাহবে আম্বেদকর একজন সূর্য।
সেই সূর্যকে পূর্ণ প্রকাশের জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদী ঘনকালো মেঘকে সরিয়ে তাঁকে সংবিধান সভায় প্রেরণ
করেন বাংলার ‘আম্বেদকর’ মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। যার অক্লান্ত সংগ্রামের ফলে এই অসাধ্য সাধন
সম্ভব হয়। যদিও বাংলার মানুষ এই মহান মহামানবদ্বয়ের সংগ্রামের ফসল ‘সংরক্ষণ- representation’ কে তো ভোগ করছে, কিন্তু যাদের
জন্য এই মহার্ঘ তাঁদের আজও আপন করে নিতে পারেনি।
অবদানঃ- ড. আম্বেদকরের ভারতের বিকাশের
ক্ষেত্রে যতোটা যোগদান আছে হয়তো অন্য কোনো রাজনেতার সেটা নেই। তিনি ছিলেন অর্থতজ্ঞ, সমাজতজ্ঞ,
আইন বিশারদ। তিনি আধুনিক ভারতের নির্মাতা। তিনি সংবিধান রচনা সমিতির
অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি এমন সংবিধান রচনা করেছেন, যেখানে সকল
নাগরিক সমান অধিকারী, ধর্মনিরপেক্ষ। বাস্তবে তিনি স্বাধীন
ভারতের ডি.এন.এ. রচনা করেছিলেন সংবিধানের মাধ্যমে। তাঁর প্রেরণায় Finance
Commission এর নির্মাণ করা
হয়। তিনি Reserve
Bank of India এর নির্মাতা। দামোদর ভ্যালী, হিরাকুণ্ড
পরিকল্পনাও তাঁর ভাবনার প্রকাশ। Employment Exchnge এর
স্থাপনাও বাবা সাহবে করেন। জল ও বিদ্যুৎ এর Gird System এর
স্থাপন তিনি করেন। স্বতন্ত্র নির্বাচন
আয়োগের নির্মাতা বাবা সাহেব। যদিও এই সব অবদানের কথা ভারতের কোনো সরকারই সরাসরি স্বীকার করে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা
দেয়নি। অর্থাৎ এইসব পরিকল্পনা ও বিচার আম্বেদকরের ছিল কিন্তু সেটার শ্রেয় অন্যে
লুটে নিয়েছে।
নারী ও শ্রমিকদের সুবিধাঃ- বাবা সাহবে
হিন্দুকোড বিল বানিয়েছিলেন নারীদের সমমর্যাদার অধিকার দেওয়ার জন্য। পিতার
সম্পত্তিতে কন্যার সমান অধিকার, বিবাহিত পুরুষ এক স্ত্রী
বর্তমান থাকতে অন্য স্ত্রীকে গ্রহণ করতে পারবেনা। যদিও তখনকার সরকার সেটার মান্যতা
দেয়নি। পরবর্তীতে সেটা চালু করা হয়। মহিলাদের মাতৃত্বকালী ছুটি, এবং প্রতিদিন আট ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ বাবা সাহেবের অবদান। তিনি যখন শ্রমসচিব (মন্ত্রী) তখন (১)কয়লা
শ্রমিকদের নানা ধরনের সহায়তা প্রদান, (২) মহিলা শ্রমিকদের প্রসবকালীন ৩২৯দিন ছুটি,
(৩) কর্ম বিনিয়োগ কেন্দ্র,
(৪) ৮ ঘণ্টা কাজের আইনী স্বীকৃতি,
(৫) ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সম্প্রসারণ,
(৬) ন্যূনতম বেতন —সহ নানা শ্রমিক
কল্যাণ আইন পাস ও কার্যকর করেন।
ধর্ম সম্পর্কে বাবা সাহবেঃ-
তিনি ১৯৩৫ সালে ঘোষণা করেছিলেন, হিন্দুধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি,
যেটা আমার কোনো কিছু হাত নেই। তবে আমি হিন্দু হয়ে মৃত্যু বরণ করব
না। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৪ই অক্টোবর হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে স্বধম্মে ফিরে যান। আর ওই
বছর ৬ ডিসেম্বর তাঁর মহাপরিনির্বাণ ঘটে।
ধর্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে
অস্বীকার করি না। তবে, প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে জীবনের ভিত্তি এবং
এই ভিত্তির উপরই গড়ে ওঠে দেশের ন্যায়পরায়ণ সরকার। তিনি আরও বলেন,
মানব জাতির প্রগতি সাধনে ধর্মের(ধম্ম) প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য্য। স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব এই মৌলিক নীতিগুলিকে ধর্ম অবশ্যই স্বীকার করে নেবে, এর উপর তিনি জোর দিয়েছেন।
সংবিধানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে
বাবাসাহেবঃ- সংবিধানের উদ্দেশ্য ছিল সমতা সতন্ত্রতা বন্ধুতা ও ন্যায়। যার জন্য
জাতীয় পতাকায় আশোক চক্র ও জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ রাখা হয়েছে। তবে তিনি সংবিধান
সংসদে পেশ করে তাঁর ভাষণে বলেছিলেন-“সংবিধান যতই ভালো লেখা হোক না কেন, সেটা বাস্তবায়িত করার লোকার যদি ভাল না হয়; তাহলে এর গুরুত্ব নেই। আবার সংবিধান যতই খারাপ লেখা হোক না
কেন, তাকে বাস্তবায়িত করার লোকেরা
যদি ভাল হয়, তাহলে সেটা বেশ কার্যকরী হবে।”
তিনি বলেন, “২৬ জানুয়ারী ১৯৫০ আমরা একটা অসংগতিপূর্ণ জীবনে (life
of contradiction) প্রবেশ করছি।
রাজনৈতিক সাম্যকেই শুধু সংবিধানে সন্নিবেশিত করতে পেরেছি,
কিন্তু সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে
অসাম্যকে সংবিধানে মেনে নেওয়া হয়েছে। রাজনীতিতে আমরা বিখ্যাত নীতি one
man, one vote, and one value মেনে
নিয়েছি। সমস্ত ভারতবাসী একজাতি। এই নীতিতে সামাজ জীবনে সৃষ্টি হবে ঐক্য। এটা হওয়া
খুবই কঠিন। কারণ, জাতব্যবস্থাটাই
anti-national, এই
জাতব্যবস্থা মানুষকে মানুষ থেকে পৃথক কর। আরও জাতব্যবস্থা anti-national
কারণ, সেটা জাতিতে জাতিতে ঈর্ষা এবং বিতৃষ্ণার (antipathy)
জন্ম দেয়।” আমার বিচারে, ধর্মনিরপেক্ষ ব্রাহ্মণ এবং পুরোহিত শ্রেণীর
ব্রাহ্মণদের মধ্যে পার্থক্য করা অর্থহীন। তারা উভয়েই পরস্পরের আত্মীয়। তাঁরা একই
শরীরের দু’টি বাহু। এক বাহুর অস্তিত্বের জন্য অন্য বাহু যুদ্ধ করতে
বাধ্য।
জাতিপ্রথা
নির্মূলন পদ্ধতিঃ- তিনি বলেন, ‘জাতিভেদ’ প্রথা নামক সামাজিক ব্যাধির খাঁট ঔষধ হল
অসবর্ণ বিবাহ। রক্তের সংমিশ্রণই আত্মীয়তা
বোধ সৃষ্টি করতে পারে। তবে তিনি আরো বলেন,‘জাত-ব্যবস্থা
নির্মূলনের প্রকৃত ঔষধ হল শাস্ত্রের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও ভক্তির মূলোচ্ছেদ করা।
উপদেশঃ-
বাবাসাহেব বলেছেন, - “যিনি তাঁর দুঃখ থেকে মুক্তি চান,
তাঁকে লড়তে হবে। আর যিনি
লড়াই করতে চান তাঁকে পড়তে হবে। কারণ জ্ঞান বিনা লড়াই করতে গেলে পরাজয় নিশ্চিত।
আধুনিক ভারতের নির্মাণের জন্য বাবা সাহেবের
দ্বারা পরিকল্পিত সমস্ত ব্যবস্থাকে চালু করা একান্ত আবশ্যক। যদিও বাবা সাহেবকে
সর্বভারতীয়দের মসিহা হিসাবে তুলে না ধরে শুধুমাত্র পিছড়েবর্গদের মসিহা হিসাবে তুলে
ধরেছে ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থা। দেশে সকলের জন্য সমান অধিকারের স্বপন বাবা সাহেব
দেখেছিলেন, কিন্তু সেটা আজ
পর্যন্ত অধুরা রয়েগেছে। ভারতবাসী ইংরেজদের গোলাম ছিল। আর অস্পৃশ্যরা ইংরেজ ও
ব্রাহ্মণ্যবাদীদের গোলাম ছিল। বর্তমানে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের গোলামি থেকে মুক্ত হওয়ার
জন্য সকলকে আদেশ দিয়েছেন ‘শিক্ষিত হও, সংগঠিত হও আর আন্দোলন করো’।
*শিক্ষার
আন্দোলন ও সমাজসংস্কারের অগ্রদূত গুরুচাঁদ ঠাকুর*
জন্ম ও শিক্ষা গ্রহণঃ- গুরুচাঁদ ঠাকুরের জন্ম
১৮৪৬ সালের ১৩ই মার্চ; বর্তমান বাংলাদেশের
ওড়াকান্দী গ্রামে। পিতার নাম হরিচাঁদ ঠাকুর মাতা হচ্ছেন-শান্তি মাতা।
পাঠশালার শিক্ষা জন্য সাধু দশরথের ও গোলকের বাড়িতে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। এইভাবে
তিন বছর শিক্ষা গ্রহণের পরে তিনি ওড়াকান্দীতে ফিরে আসেন। ওড়াকান্দীতে কোন উচ্চবর্ণীয়দের স্কুলে ভর্তি হতে পারেন না।
কারণ তিনি তো পতিত অস্পৃশ্য নিচু জাতির লোক। তখন বাধ্য হয়ে তিনি মুসলমানদের মক্তবে
ভর্তি হন। সেখানে আর্বি, পার্সী ভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করেন। মক্তবের
শিক্ষা সমাপ্ত হলে উচ্চ শিক্ষার কোন সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে মাত্র ১২ বছর
বয়সে ১৮৫৮ সালে তাঁকে শিক্ষা গ্রহণ বন্ধ করতে হয়।
শিক্ষার আন্দোলনঃ- গুরুচাঁদ
ঠাকুর একাধারে যেমন ছিলেন প্রথাগত (একাডেমিক) শিক্ষার প্রসারের অগ্রদূত। তেমনি
তিনি অন্য দিকে ছিলেন সামাজিক শিক্ষার ধারক ও বাহক। অর্থাৎ
Education for earning and education for learning. গুধুমাত্র
একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই সে প্রকৃত শিক্ষার অধিকারী হতে পারেনা; সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া। তিনি চেয়েছিলেন শুধু পুথিগত শিক্ষায় নয়, সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত পূর্ণ মানুষ, কুসংস্কার মুক্ত মানুষন গড়ে তুলতে।
শিক্ষার প্রসারের জন্য তাঁর শ্লোগান ছিল-
খাও বা না খাও তা’তে কোন দুঃখ
নাই।
ছেলে পিলে শিক্ষা দেও এই আমি
চাই।।
-গুরুচাঁদ
চরিত- পৃঃ ১৪৪
তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অশিক্ষা হচ্ছে মারণ রোগ। তার জন্য তিনি ঘোষণা করলেন, খেতে না
পাওয়ার অভাব থেকে অশিক্ষার অভাব আরো অনেক বড়। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে সন্তানদের
শিক্ষিত করতে হবে। প্রয়োজনে ভিক্ষা করেও অশিক্ষার অন্ধকারকে দূর করতে হবে।
বালক বালিকা দোঁহে পাঠশালে দাও।
লোকে বলে “মা’র গুণে ভাল হয় ছা’ও।। (পৃঃ ৫২৯)
তিনি
সকলের জন্য
বিদ্যা অর্জনের উপর জোর দেন। আর গ্রামে গ্রামে পাঠশালা করার আহ্বান জানান।
নারীকেও শিক্ষিত হওয়ার কথা বলেন। কারণ, মা’ শিক্ষিত হলে সন্তানও শিক্ষিত হবে।
১৮৮০
(১২৮৭ বাংলা) সালে নভেম্বর মাসে অনুন্নত শ্রেণির জন্য ১ম পাঠশালা তৈরী করা হয়।
বিদ্যার
কারণে দান দানের প্রধান।
বিদ্যাহীন
নর দেখ পশুর সমান।। -গুরুচাঁদ চরিত -৫৩০
যিনি বিদ্যা লাভ করেছেন, তিনি যদি অন্যকে সেই বিদ্যা দান করেন তাহলে সেই দানের ফলে দেশ, সমাজ ও জাতির প্রগতি হবে। সমস্ত বাঁধার অন্ধকার দূর হয়ে জ্ঞানের আলো ফুটে
উঠবে। তিনি বিদ্যাহীন মানুষকে পশুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। শিক্ষিত হলে সমাজের অন্ধ
ধর্মীয় শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রাম করা যাবে। গোলামী থেকে মুক্ত হওয়া
যাবে।
তিনি আরো বললনে- কুসংস্কার আছে যত দূর কর’ অবিরত
বিদ্যা
শিক্ষা কর ঘরে ঘরে। গুরুচাঁদ চরিত পৃ.১১৯
কুসংস্কার হচ্ছে সমাজের ক্ষতিকারক ভাইরাস। এই ভাইরাস
থেকে প্রতি নিয়ত দূরে থাকতে হবে। আর তার জন্য ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো জ্বালাতে হবে। তাঁর
এই শিক্ষার আন্দোলনের ফল স্বরূপ- আমরা
বর্তমান দশম
শ্রেনির ‘স্বদেশ পরিচয় ও পরিবেশ’ –বইতে দেখতে পাই- ‘তাঁর উদ্যোগে ৩৯৫২টি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।’
সংরক্ষণের ব্যবস্থাঃ- বাংলার ৩১টি
সম্প্রদায়কে নিয়ে “বঙ্গীয় তপঃশীল ভূক্ত জাতি” আইন সৃষ্টি হয়। অনুনন্ত শ্রেণীর মানুষের
শিক্ষা, চাকুরী ও আইন সভায় যে আসন সংরক্ষিত হয়েছিল,
তার মূলে ছিলেন যুগনায়ক শ্রীশ্রীগুরুচাঁদ ঠাকুর এবং সংঘবদ্ধ মতুয়া
আন্দোলন। ভারতবর্ষের মত বর্ণভিত্তিক বা সম্প্রদায় ভিত্তিক দেশে সংঘবদ্ধ আন্দোলন
ছাড়া কোন দাবী আদায় করা যায় না। ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা
প্রতিষ্ঠানে এবং সরকারী অফিসে অনুন্নত শ্রেণির
মানুষের জন্য জনসংরক্ষণ ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হয়ে যায়। ১৯১৮ খ্রীষ্টাব্দে
কলিকাতায় অনুরূপ একটি হোস্টেল খোলা হয় এবং
তার পরিচালন ভার কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর
ন্যাস্ত হ্য। ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার আইনে অনুন্নত
শ্রেণির এই সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা
ঘোষণা করা হয়।
সমাজ
সংস্কারঃ- তিনি বলেন,
শ্রদ্ধা হলে শ্রাদ্ধ হয় শাস্ত্রের প্রমাণ।
মূলতত্ত্ব নাহি জানে যতেক অজ্ঞান।। -গুরুচাঁদ চরিত
পৃ. ৪৫৪/৪৫৫
অর্থাৎ বৈদিক
প্রথায় মৃতের যে অনুষ্ঠান করা হয়ে যেটা আসলে পেটপূজা। মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো
হচ্ছে আসল কাজ। সেটা সাধ্যমতো করা দরকার। কিন্তু অজ্ঞানতা বশত পূজারীর দ্বারা
ব্লাকমেলের শিকার হয়ে অকারণে অর্থ ব্যয় করে।
বাল্যকালে পুত্র কন্যা বিয়া নাহি দিবে।
পথ ঘাট ঘর দ্বার পবিত্র রাখিবে।। গুরুচাঁদ চরিত পৃ. ৫২৯
তিনি বাল্যকালে পুত্র কন্যাকে বিবাহ দিতে মানা করেন এবং পথ
ঘাট সব পরিস্কার রাখার নির্দেশ দেন। এ বিষয়ে দেখতে পাই- ১৯০৮ সালে ঠিক হয়, কোনো নমঃশূদ্র বিশ বছরের কম বয়সের ছেলে এবং দশ
বছরের কম বয়সের মেয়ের বিবাহ দিতে পারবেনা। ১৯১০ সালে বিধবা বিবাহ প্রচলন
করেন। আর বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “আমি জন্মগত কারণে নমঃ জাতির
মধ্যে জন্মগ্রহণ করলেও আমি তাদের, যারা পদদলিত, পীড়িত, অত্যাচারিত, যাদের সব সময় দুঃখ-কষ্ট
নিয়ে জীবন কাটাতে হয়। যাদেরকে দেখলে উচ্চবর্ণীয়রা
অচ্ছুৎ বলে ঘৃণা করে। যাদের পেটে খাবার নেই। শিক্ষার আলো যাদের মধ্যে
পৌঁছায়নি। যাদের সহায় সম্বল বলে কিছুই নেই। তারাই হচ্ছে আমার আপন জন।”
আত্মোন্নতি অগ্রভাগে প্রয়োজন তাই।
বিদ্যাচাই, ধন চাই, রাজকার্য চাই।। -গুরুচাঁদ
চরিত পৃ. ৫৭৩
শুধু
শিক্ষিও ও সম্পদ শালী হলেই হবে না। আপনাকে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেও দখল করতে হবে। কারণ, সেখানেই শাসন ব্যবস্থার ও দেশের প্রগতির সব ক্ষমতা গচ্ছিত আছে। আপনাকে
সেটাকে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে হবে।
সকল মানুষ সমান ভেদাভেদ নেইঃ-
মানুষ সবার শ্রেষ্ঠ ভেদাভেদ ইষ্টানিষ্ট
কর্মগুণে মান পায় জন্মগুণে নয়। -গু.চ. পৃ. ৭৩
গুরুচাঁদ ঠাকুরের কাছে, সকল মানুষই
সমান। মানুষের মধ্যে কোনো উচু নিচু ভেদাভেদ নেই; নেই কোনো
জাতির বিচার। জন্ম নয়, কর্ম গুণই
প্রধান। এই কথার মধ্যে দিয়ে তিনি বৈদিকতার জাতিপ্রথাকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান
করেছেন।
নরাকারে ভূমণ্ডলে যত জন আছে।
‘এক জাতি’ বলে মান্য পাবে মোর কাছে।।
গু.চ. পৃ. ২০১
এই
বিশ্বে যতো মানুষ আছে তারা সকলে আমার কাছে একজাতি। অর্থাৎ মানবজাতি বলে মান্যতা
পাবে।
বিশ্বভরে এই নীতি দেখি
পরস্পর।
যে যা’রে উদ্ধার করে সে তার ঈশ্বর।। (গু. চ.
পৃঃ ৫২৯)
ঈশ্বর এখানে
কোন অলীক কেউ নন। তিনি হচ্ছেন উদ্ধার কর্তা। এই নিপীড়িত
বঞ্চিতদের উদ্ধার কর্তা হচ্ছেন,- মহামানব গৌতম বুদ্ধ, হরিচাঁদ
ঠাকুর, গুরুচাঁদ
ঠাকুর, মহাপ্রাণ যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল,
বাবা সাহেব ড. ভীম রাও আম্বেদকর, পেরিয়ার, গুরু নানক, গুরু
রবিদাস, মাতা সাবিত্রীবাই ফুলে, মহাত্মা
জ্যোতিরাও ফুলে, ফতেমা শেখ, বেগম
রোকেয়া, বিরসা মুণ্ডা, সিধু-কানু
ইত্যাদি। আবার বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এরকম দেখতে পাই, যেমন- মার্টিন লুথার, জন
আব্রাহাম লিঙ্কন, নেলসন মেন্ডেলা ইত্যাদি।
১৯৩৭ সালে ৯১ বছর বয়সে ২৭ শে মার্চ গুরুচাঁদ ঠাকুরের
মহাপরিনির্বাণ হয়। স্মৃতি সভায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু গুরুচাঁদ
ঠাকুরকে “মহামানব” হিসাবে
শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।

Comments
Post a Comment